পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রথম সরকার গঠনের পর দায়িত্ব নিয়েই একের পর এক কড়া পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, যা ইতোমধ্যেই রাজ্যে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। প্রশাসনিক রদবদল, সীমান্তনীতি, আইনশৃঙ্খলা অভিযান থেকে শুরু করে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নসহ প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলো সাধারণ মানুষ ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এ খবর জানিয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ
নির্বাচনের পর থেকেই রাজ্যজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতাদের দাবি, বিজেপির সরকার গঠনের প্রথম সাত দিনেই তৃণমূল কর্মীদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে এবং তাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। প্রাণভয়ে অনেক কর্মীই ঘরছাড়া হয়েছেন। এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে ও তৃণমূল কর্মীদের সুরক্ষার দাবিতে গত ১২ মে স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা হাইকোর্টে গিয়ে আইনি লড়াই শুরু করেছেন এবং সহিংসতা কবলিত এলাকা পরিদর্শনের জন্য ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করেছেন।
পুলিশ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত
নবান্নে এক সংবাদ সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কলকাতার সাবেক পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলসহ ৩ জ্যেষ্ঠ আইপিএস কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার ঘোষণা দেন। আরজি কর হাসপাতালের ঘটনা ভুলভাবে সামলানোর অভিযোগে এই ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করছেন বিরোধীরা। সিপিআই-এম রাজ্য সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে প্রশ্ন তুলেছেন, আর জি কর মামলায় মূল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই আসলে কী করল? তারা বড় কোনও ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন করতে না পারলেও সিবিআই কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ড ও বুলডোজার অভিযান
গত ১২ মে কলকাতার তিলজলার একটি চামড়া কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই শ্রমিকের মৃত্যু এবং পাঁচজন আহত হন। এই মানবিক ট্র্যাজেডির পর মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নতুন মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে ভবনটিকে ‘অবৈধ’ তকমা দিয়ে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এই একতরফা পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ)-এর ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী বলেন, এটি সুশাসনের কোনও উদাহরণ হতে পারে না। ভবনের মালিকদের কাগজপত্র দেখানোর ন্যূনতম সময় না দিয়ে এমন একতরফা সিদ্ধান্ত অত্যন্ত নিন্দনীয়। মোহাম্মদ সেলিমও প্রশ্ন তোলেন, বুলডোজার দিয়ে ভবন ভাঙা হলো, কিন্তু যে দরিদ্র শ্রমিকরা মারা গেলেন বা যারা কাজ হারালেন, তাদের ক্ষতিপূরণের কী হবে?
ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ
১৩ মে সরকার জনসমক্ষে পশু কোরবানি নিষিদ্ধ করে একটি কঠোর বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। এছাড়া রাস্তা বন্ধ করে কোনও নিয়মিত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান করা যাবে না এবং মন্দির-মসজিদসহ সব উপাসনালয়ে লাউডস্পিকারের শব্দ নিয়ন্ত্রণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা বহু মানুষের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভোটার তালিকা ও রেশন কার্ড বিতর্ক
শুভেন্দু সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে (এসআইআর) যাদের ভোটার নাম বাদ পড়েছে, তারা আর কোনও রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না। বিরোধীদের আশঙ্কা, এর মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বহু মানুষের নাম বাদ দিয়ে তাদের মৌলিক অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয় থেকে বঞ্চিত করা হবে। এছাড়া রেশন কার্ড স্ক্রিনিংয়ের নামে ‘অ-ভারতীয়’ খোঁজার অজুহাতে সাধারণ মানুষকে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে।



