প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাগবাড়ী সফরে কলেজ সরকারীকরণ ও ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে নিজের পৈতৃক ভিটা জিয়াবাড়িতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ সফর সম্পন্ন করেছেন। আজ সোমবার দুপুরে তিনি শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজকে সরকারীকরণের ঘোষণা দেন, যা এলাকাবাসীর জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠান
বেলা তিনটার দিকে কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের পাইলটিংয়ের দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী জোবাইদা রহমান বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত এলাকাবাসীর সঙ্গে রসিকতাপূর্ণ আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি থেমে যান, তখন গ্রামবাসী তাঁকে আরও দুই ঘণ্টা বক্তব্য দেওয়ার অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রী হাসিমুখে জবাব দেন, ‘আরে খিদা পাইছে আমার। বাপের বাড়িতে খেতে দিবেন না? নামাজ বাকি, খাওয়া বাকি, খাল কাটা বাকি, জনসভা বাকি। আবার ঢাকায় যেতে হবে। আসব আবার, কথা বলব।’
কলেজ সরকারীকরণ ও ফ্যামিলি কার্ড পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ‘দুই যুগ পর এই কলেজ মাঠে আজ আসতে পেরেছি। ১০ বছর ধরে এই ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলাম। আজ নিজের গ্রামে এসে মা-বোনদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দিতে পেরেছি।’ তিনি ঘোষণা করেন যে আগামী ৩০ তারিখের মধ্যে ২৩ উপজেলায় নারীদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হবে এবং ৫ বছরে সারা দেশে ৪ কোটি পরিবারের বেশির ভাগ মায়েদের হাতে এ কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে।
এছাড়াও, প্রধানমন্ত্রী হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২৬ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন, যা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিরোধীদের সমালোচনার জবাব ও উন্নয়ন পরিকল্পনা
বিরোধীদের সমালোচনার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনের আগে আমরা কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলেছিলাম, অনেকেই অনেক কথা বলতে পারে। এত টাকা কোথা থেকে আসবে? বিগত সরকারের সময়ে দেশ থেকে লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। আমরা দুর্নীতি রোধ করতে চাই। কারণ, যে টাকা পাচার হয়েছে, এটা জনগণের টাকা। আমরা জনগণের সেই টাকা দিয়ে কৃষক কার্ড দেব। ফ্যামিলি কার্ড দেব। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করে দেব।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। এই গ্রামের মানুষকে ঘিরে আগামী পাঁচ বছরে আমরা বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। নারী-পুরুষ দুজনকেই সমানভাবে রাষ্ট্র থেকে সহযোগিতা দিতে চাই।’
উপজেলা ঘোষণার দাবি ও যুদ্ধের প্রভাব
অনুষ্ঠানে কয়েকজন বক্তা বাগবাড়ীকে উপজেলা ঘোষণার দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী জবাবে চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে যেখান থেকে তেল-গ্যাস আমরা আনতাম, সে দেশগুলো আক্রান্ত হয়েছে। শুধু তা–ই নয়; যে জাহাজে করে আমরা তেল আনতাম, সেই রাস্তাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। তেল আনতেও কষ্ট হচ্ছে। যে দেশ থেকে তেল আনতাম, সেখানেও বাড়তি দাম। বাড়তি দাম দিয়ে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন আনতে হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রের অনেক অর্থ চলে গেছে। এই অর্থ জনগণের। সেই কারণে বিবেচনা করে উন্নয়ন করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই এলাকা শহীদ জিয়ার জন্মস্থান। আপনাদের যেমন শহীদ জিয়া, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের ওপর হক আছে, সারা দেশের মানুষেরও হক আছে। শুধু গাবতলী বা বাগবাড়ীতে উন্নয়ন করলে হবে? সারা দেশই উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। আমি তো আছিই আপনাদের কাছে, এলাকার উন্নয়ন হবে। কিন্তু সারা দেশের প্রতি নজর দিতে হবে।’
অন্যান্য কার্যক্রম ও উপস্থিতি
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রী ১০ জন নারীর হাতে প্রতীকী ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন। এছাড়া, প্রধানমন্ত্রী বাটন প্রেস করার সঙ্গে সঙ্গে ৯১১ জন নারীর মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা পৌঁছে যায়, যা আর্থিক সহায়তার একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ।
বাগবাড়ী গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া চৌকিরদহ খালের খননকাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খালপাড় থেকে হেঁটে বেলা সাড়ে তিনটার দিকে তিনি ও তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমান পৈতৃক ভিটা জিয়াবাড়িতে যান এবং সেখানে কিছু সময় কাটানোর পর প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে বগুড়া সার্কিট হাউসে ফেরেন।
বিকেল পাঁচটায় প্রধানমন্ত্রী বগুড়া শহরের ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় যোগ দেন, যা তাঁর সফরের পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে গণ্য হয়।
অনুষ্ঠানে বগুড়া-৭ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হেলালুজ্জামান তালুকদার, একই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মোরশেদ মিল্টন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা, ফ্যামিলি কার্ডের সুফলভোগী নারী ভারতী রানী ও বাবলী আকতার বক্তব্য দেন, যা অনুষ্ঠানটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।



