জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে, যার ফলে মেধাবী পরীক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিটি পরীক্ষাতেই অস্বাভাবিক সংখ্যক শিক্ষার্থী বহিষ্কারের ঘটনা ঘটছে। এই বিশৃঙ্খল পরীক্ষা ব্যবস্থাকে ‘প্রহসন’ বলে মন্তব্য করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। পরীক্ষা কেন্দ্র ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে তিনি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
বহিষ্কারের সংখ্যা উদ্বেগজনক
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে নকলের প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১৮টি পরীক্ষায় নকল ও অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ হাজার ৫৭১ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর মধ্যে অনার্স পর্যায়ের পরীক্ষাতেই সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ২৭২ জন শিক্ষার্থী শাস্তির মুখে পড়েছেন। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপাচার্য নিজেই পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন।
উপাচার্যের অসন্তোষ ও পদক্ষেপ
গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতর জানায়, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে পরীক্ষা নেওয়া একটা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। যতদিন পর্যন্ত পরীক্ষাকেন্দ্র ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষক-কর্মকর্তা সবার নৈতিক উন্নয়ন হবে না, ততদিন পর্যন্ত পরীক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়া মানসম্মত হওয়ার কোনও সুযোগ নেই।’ মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে পরীক্ষাকেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। গত ৩০ এপ্রিল ময়মনসিংহের বেশ কয়েকটি পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শনকালে একটি কেন্দ্রে অসদুপায় অবলম্বনের জন্য ১০ জন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়।
পরীক্ষা কেন্দ্র বাতিলের সিদ্ধান্ত
উপাচার্য বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রে পরিদর্শন টিম পাঠিয়ে নিরীক্ষা চালাচ্ছেন। যেসব কেন্দ্র জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বজায় রাখতে পারবে না, সেসব কেন্দ্র বাতিল করে নতুন করে উপযুক্ত পরীক্ষা কেন্দ্র নির্বাচন করা হবে। প্রয়োজনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। কোনও জেলা বা উপজেলায় অনার্স প্রথম বর্ষ থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত সব পরীক্ষা নেওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়া গেলে সেসব কেন্দ্রে আর পরীক্ষা নেওয়া হবে না। স্থানীয় পাবলিক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্র করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া হবে।
পর্যবেক্ষক ও পরীক্ষক প্রশিক্ষণ
যেসব কেন্দ্রে পরীক্ষা নেওয়া অব্যাহত থাকবে, সেসব কেন্দ্রের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের উদ্বুদ্ধ করতে উদ্যোগ নিচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। পরীক্ষার দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনে যাওয়া শিক্ষকদেরও সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
ঢাকার কেন্দ্রও বাতিলের আওতায়
রাজধানীসহ ঢাকায় যেসব পরীক্ষা কেন্দ্র রয়েছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা নেওয়ার পরিস্থিতি না থাকলে বা নকলের অভিযোগ থাকলে সেসব কেন্দ্র বাতিল করা হবে এবং নতুন করে কেন্দ্র নির্বাচন করা হবে।
সিসিটিভি ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক
ঢাকা শহরসহ অন্যান্য শহরের যেসব কেন্দ্রে সিসিটিভি মনিটরিং ব্যবস্থা আছে, সেসব কলেজকে কেন্দ্র হিসেবে নির্বাচনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
আসন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন
বর্তমান ব্যবস্থায় একই কেন্দ্রে বিভিন্ন বিষয়ের পরীক্ষা একসঙ্গে নেওয়া হয় এবং পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও বেশি থাকে। পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত রাখতে একই বিষয়ের পরীক্ষা একটি কেন্দ্রে নেওয়া হবে এবং আসন সংখ্যার অনুপাত ঠিক রেখে পরীক্ষার্থীদের আসন বিন্যাস ঠিক করা হবে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
পরিস্থিতি উত্তরণের বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, ‘আমরা যে সমস্ত কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা সরেজমিনে লোক পাঠিয়ে পরিদর্শন করছি। এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর যে সমস্ত কেন্দ্র জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যান্ডার্ড ও মান বজায় রাখতে পারবে না, সেগুলো বাতিল করা হবে। বাতিল করে ওই জেলা বা উপজেলায় অবস্থিত যে কলেজ মান বজায় রাখতে পারবে, সেখানে কেন্দ্র নেওয়া হবে। প্রয়োজনে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা নিয়ে সেখানে পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের চিন্তা-ভাবনা করছি। উদাহরণস্বরূপ, আইনের পরীক্ষাগুলো আমরা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিচ্ছি, যা সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে।’
উপাচার্য আরও বলেন, ‘ঢাকা শহরের অনেক কলেজের কেন্দ্র পরিবর্তন করতে হতে পারে। যেসব কলেজে সিসিটিভি মনিটরিং ব্যবস্থা আছে, সেগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। মনিটরিংয়ের বিষয়ে আমরা যে সমস্ত অফিসার কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় যান এবং শিক্ষকরা পরীক্ষার ডিউটি দেন, তাদের ব্যাচ অনুযায়ী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা শুরু করতে যাচ্ছি।’
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. এনামুল করিম বলেন, ‘আমরা দুটি পদক্ষেপ নিচ্ছি। প্রথমত, একটি বিষয়ের পরীক্ষা যেন একই রুমে না বসে সে ব্যবস্থা নিচ্ছি। দ্বিতীয়ত, পর্যবেক্ষণের মান বাড়াতে কর্মকর্তা ও শিক্ষক সমন্বয় করে দায়িত্ব বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। নকলমুক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে সব রকম উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’



