গাজীপুরের গ্রামাঞ্চলে চলমান তাপপ্রবাহের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন, তারা প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং সহ্য করছেন।
গ্রামীণ বিদ্যুৎ এলাকায় দুর্ভোগ
শ্রীপুর উপজেলার গ্রামীণ বিদ্যুৎ বিতরণ এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর ফলে পরিবার, কৃষি, পোল্ট্রি খামার, ব্যবসা ও শিক্ষা ক্ষেত্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা অবশ্য পরিস্থিতির জন্য বিদ্যুৎ চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে অমিলকে দায়ী করেছেন। তাদের মতে, অতিরিক্ত তাপে বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শহর-গ্রামের বৈষম্য
বাসিন্দারা বলছেন, শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও গ্রামীণ জনপদে সংকটের শিকার হতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই আবার চলে যাচ্ছে।
গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর গ্রাহকরা অভিযোগ করছেন, প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। অনেকে বলছেন, একটানা মাত্র ৪০ থেকে ৫০ মিনিট বিদ্যুৎ থাকে, তারপর আবার চলে যায়।
পোল্ট্রি খাতে বড় ধাক্কা
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতি পোল্ট্রি খাতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। খামারিরা বলছেন, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহে কুলিং ফ্যান, বায়ু চলাচল ব্যবস্থা ও পানি বিতরণ ব্যাহত হচ্ছে, ফলে মুরগির মৃত্যু বেড়েছে।
শ্রীপুর উপজেলার গুশিংগা এলাকার পোল্ট্রি খামারি মনির হোসেন বলেন, “অর্ধঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেই খামারের ভেতরে তাপমাত্রা অসহনীয় হয়ে ওঠে। কয়েকদিন আগে আমার খামারে লোডশেডিংয়ের কারণে প্রায় ১০০ ব্রয়লার মুরগি মারা গেছে।”
আরেক পোল্ট্রি খামারি সোহেল রানা বলেন, “বিদ্যুৎ চলে গেলে ফ্যান ও পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, মুরগি অস্থির হয়ে ওঠে। কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। এখন লাভের চেয়ে লোকসানের চিন্তা বেশি হয়।”
দুগ্ধ খামারেও সংকট
বর্মী ইউনিয়নের গাড়ারান এলাকার দুগ্ধ খামারি জুবায়ের আহমেদ বলেন, “প্রচণ্ড তাপ ও বিদ্যুৎ সংকটে দুধ উৎপাদন কমে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে হয়, কিন্তু ডিজেলের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বাজারে দাম বাড়েনি।”
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা কাওরাইদে
কাওরাইদ রেলওয়ে স্টেশন এলাকার বাসিন্দা সেলিম মিয়া অভিযোগ করেন, “মাওনা জোনাল অফিসের কাওরাইদ সাবস্টেশনের গ্রাহকরা সবচেয়ে বেশি লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছি। দিনে মাত্র ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই, বাকি ১০ ঘণ্টা অন্ধকারে কাটে। মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই।”
সেচ ও কৃষি ব্যাহত
বর্মী ইউনিয়নের কাশিজুলী গ্রামের কৃষক মোবারক আলী বলেন, “প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই না। তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে সময়মতো জমিতে সেচ দিতে পারছি না।”
গৃহস্থালির দুর্ভোগ
শ্রীপুর পৌরসভার গৃহিণী মাহফুজা আক্তার বলেন, “গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতি রাতে ৫-৬ ঘণ্টা লোডশেডিং। গরমে ঘুমাতে পারছি না, বাচ্চাদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে।”
পৈতলবাড়ি গ্রামের রহিমা খাতুন বলেন, “বেশ কয়েকদিনের জন্য শাকসবজি ও বাজার কিনে রাখি, কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকলে বেশিরভাগ নষ্ট হয়ে যায়।”
কৃষকদের উদ্বেগ
কৃষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বিদ্যুৎ সংকট অব্যাহত থাকলে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। অনেকে বলছেন, বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কায় নতুন মুরগির বাচ্চা নিতে চাইছেন না।
বর্মী এলাকার তরুণ কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, “ঋণ নিয়ে খামার শুরু করেছি, কিন্তু ঘন ঘন লোডশেডিং বিনিয়োগের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঠিক পরিবেশ বজায় রাখতে না পারায় ছোট বাচ্চারা বেশি অসুস্থ হচ্ছে। ঘন ঘন লোডশেডিং স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করছে এবং রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।”
শিক্ষার্থীদের সমস্যা
বাসিন্দারা আরও অভিযোগ করেন, পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীরা বিদ্যুৎ না থাকায় পড়ালেখায় সমস্যায় পড়ছে। রাতে লোডশেডিংয়ে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে।
বিদ্যুৎ কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর শ্রীপুর জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুল আলম বলেন, “প্রচণ্ড তাপে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি সামলাতে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “শ্রীপুর উপজেলার মূল এলাকাগুলো রাজাবাড়ি ও রাজেন্দ্রপুর গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ পায়, যেখানে চাহিদা বর্তমানে প্রায় ৫০ মেগাওয়াট। বর্তমানে এসব এলাকায় লোডশেডিং ৪৫% থেকে ৫০% পর্যন্ত।”



