প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের বিদায়ী ভাষণ: নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সূচনা
সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন অভিযাত্রার সূচনা। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় উপলক্ষে দেওয়া এই ভাষণে তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানান।
নির্বাচন ও গণতন্ত্রের নতুন দিগন্ত
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস উল্লেখ করেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ, ভোটার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচন–সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্মিলিতভাবে একটি প্রশংসনীয় নজির সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্বাচন কেমন হওয়া উচিত—এই নির্বাচন তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, ‘হার-জিতই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। যাঁরা জয়ী হয়েছেন, তাঁরা মোট ভোটের প্রায় অর্ধেক পেয়েছেন। যাঁরা জয়ী হতে পারেননি, তাঁরাও মোট ভোটের অর্ধেক পেয়েছেন।’
১৮ মাসের দায়িত্ব পালন ও চ্যালেঞ্জ
১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রাক্কালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আজ আমি আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য উপস্থিত হয়েছি।’ তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সময়ের কথা উল্লেখ করে কীভাবে দায়িত্বে এলেন, সেই ব্যাখ্যা দেন। দায়িত্ব পালনের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের ভেতরে যারা পালিয়ে যায়নি, তাদের মধ্যে কাকে বিশ্বাস করবেন, কাকে করবেন না—এটি মহাসংকট হয়ে দাঁড়াল।
সংস্কার ও প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনীতি ও প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে রেখেছে। ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, আর্থিক সংস্কারে হাত দিয়েছে; যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেকে স্থাপন করতে না পারে। তিনি উল্লেখ করেন, গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেয়ালে দেয়ালে তরুণেরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন এঁকেছিল, এর কেন্দ্র ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করেছে এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, যার প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।
- পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন করে পুলিশকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
- বিচার বিভাগকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে পৃথক সচিবালয় গঠন, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ কাঠামো এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনে যুগান্তকারী সংস্কার করা হয়েছে।
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
আওয়ামী লীগের শাসনামলের গুম-খুনসহ নিপীড়নের কথা উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভবিষ্যতে আর কখনো যেন কোনো জালেম মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। এর জন্য কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকারই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক ও গভীর সংস্কার। তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের রক্তাক্ত স্মৃতি এখনো আমাদের মধ্যে তাজা হয়ে আছে। যারা ভয়াবহ নিপীড়ন ও নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের বিচার করা এবং যেন আর কেউ এ ধরনের দুঃশাসন কায়েম করতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করা আমাদের গুরুদায়িত্ব।’
পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
পররাষ্ট্রনীতিতে দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও দেশের মর্যাদা—এই তিনটি মূল ভিত্তি দৃঢ়ভাবে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন নতজানু পররাষ্ট্রনীতি কিংবা অপর দেশের নির্দেশনা ও পরামর্শনির্ভর নয়। খোলা সমুদ্র কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয়—এটি দেশকে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার উন্মুক্ত দরজা। নেপাল, ভুটান ও সেভেন সিস্টার্সকে নিয়ে এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও শুল্কচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।
বিদায় ও নতুন বাংলাদেশের আহ্বান
অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিচ্ছে, কিন্তু গণতন্ত্র, জবাবদিহি, বাক্স্বাধীনতা ও অধিকার চর্চার যে ধারা শুরু হয়েছে, তা যেন কখনো থেমে না যায়—এমন আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছেড়ে গেলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার সার্বিক দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সবার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের জন্য এই দরজা খুলে দিয়েছে, আমরা যদি স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও শক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।’
