সিলেটে নির্বাচনে জামায়াতের ভরাডুবি: কারণ ও প্রতিক্রিয়া
সিলেট বিভাগে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। বেসরকারিভাবে ঘোষিত ফলাফলে দেখা গেছে, বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে ১৮টিতেই বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। কেবল সিলেট-৫ (কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ) আসনে জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ আবুল হাসান জয় পেয়েছেন। জামায়াতের নেতারা এই পরাজয়ের কারণ খুঁজে দেখছেন, অন্যদিকে বিএনপির নেতারা তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাকে সাফল্যের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল ও মনোনয়ন সংকট
জামায়াতের স্থানীয় নেতা ও সমর্থকদের মতে, দলটি বেশ কিছু আসনে অপরিচিত ও নতুন প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছে, যা ভোটারদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে, হবিগঞ্জ-১ ও সিলেট-৩ আসনে শক্তিশালী প্রার্থী মোহাম্মদ শাহজাহান আলী ও লোকমান আহমদকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও শেষ মুহূর্তে জোটের শরিকদের চাপে তাদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এ ছাড়া, হবিগঞ্জ-৪ আসনে দুই দফা প্রার্থী পরিবর্তনের পর খেলাফত মজলিসের আহমেদ আবদুল কাদেরকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, যিনি কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেননি।
জামায়াতের এক নেতা জানান, শরিক দলকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে নিজেদের শক্তিশালী প্রার্থীদেরও মনোনয়ন না দেওয়া একটি বড় দুর্বলতা ছিল। এ ছাড়া, সুনামগঞ্জের একটি আসনে প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল, শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তন এবং তিনটি আসন উন্মুক্ত রাখাও পরাজয়ের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চা-বাগানে এজেন্ট সংকট ও ভোটার মনোভাব
সিলেট মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলী উল্লেখ করেন, চা-বাগানের ভোটকেন্দ্রগুলোতে কোনো এজেন্ট না থাকায় জোট লক্ষাধিক ভোট থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপির কর্মীরা নির্বাচনের আগের রাতে আতঙ্ক ছড়িয়ে ও টাকা বিলিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করেছেন, যা ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
অন্যদিকে, সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী দাবি করেন, বিএনপির সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন এবং মানুষজন আগের সরকারের অপশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে তাদের ইশতেহারকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। তিনি জামায়াতের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, জামায়াতই ভোট কেনাসহ নানা অপকর্ম করেছে, এবং ভোটাররা ব্যালটের মাধ্যমে এর জবাব দিয়েছেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
জামায়াতে ইসলামী সিলেট বিভাগে অতীতেও তেমন সাফল্য দেখাতে পারেনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে সিলেট-৫ আসনে জয়ী হওয়া ছাড়া সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে দলটির উল্লেখযোগ্য অর্জন নেই। বর্তমানে, জামায়াতের নেতারা পরাজয়ের কারণ চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন, যদিও দলটির সিলেট মহানগরের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এই নির্বাচনী ফলাফল সিলেটের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে, যেখানে বিএনপির জয়জয়কার ও জামায়াতের সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে জামায়াতের কৌশলগত পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
