গোপালগঞ্জে ইতিহাস: প্রথমবারের মতো তিন সংসদীয় আসনেই জয় পেল বিএনপি
গোপালগঞ্জে ইতিহাস: তিন আসনেই জয় পেল বিএনপি

গোপালগঞ্জে ইতিহাস সৃষ্টি: প্রথমবারের মতো তিন সংসদীয় আসনেই জয় পেল বিএনপি

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এনে গোপালগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই জেলায় প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে সব আসনে ধানের শীষের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে দেখা যায়, জেলার তিনটি আসনেই বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয় নিশ্চিত করেছেন।

১৯৮৪ সালের পর প্রথম ঘটনা

১৯৮৪ সালে জেলা প্রতিষ্ঠার পর এটাই প্রথম ঘটনা যখন গোপালগঞ্জে একযোগে তিন আসনে বিএনপি জয় পেল। জেলায় মোট ভোটার ছিলেন ১০ লাখ ৯২ হাজার ৬১৮ জন এবং ৩৯৭টি কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবারের নির্বাচনে গোপালগঞ্জের ভোটাররা নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা জেলার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মোড় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

গোপালগঞ্জ–১ আসনে জয়ী মো. সেলিমুজ্জামান মোল্যা

গোপালগঞ্জ–১ (মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী একাংশ) এ আসনে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (ফরিদপুর বিভাগ) মো. সেলিমুজ্জামান মোল্যা। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ৭১ হাজার ৫৭৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. কাবির মিয়া (ট্রাক) পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৪৬৪ ভোট, যিনি কারাবন্দি অবস্থায় নির্বাচন করেন। উল্লেখ্য, ১৯৯৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই আসনে টানা ছয়বার সংসদ সদস্য ছিলেন আওয়ামী লীগের মুহাম্মদ ফারুক খান।

গোপালগঞ্জ–২ আসনে জয়ী ডা. কে এম বাবর আলী

গোপালগঞ্জ–২ (সদর ও কাশিয়ানী একাংশ) এ আসনে জয়ী হয়েছেন ডা. কে এম বাবর আলী। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই চিকিৎসক ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৪০ হাজার ৪৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এইচ খান মঞ্জু (হরিণ) পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৩৯ ভোট। তিনি জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এই আসনে ১৯৮৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা আটবার সংসদ সদস্য ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম।

গোপালগঞ্জ–৩ আসনে জয়ী এস এম জিলানী

গোপালগঞ্জ–৩ (টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া) এ আসনে জয় পেয়েছেন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এস এম জিলানী। টুঙ্গিপাড়ার সন্তান জিলানী ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৬০ হাজার ১৬৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক (স্বতন্ত্র, ঘোড়া) পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৮৬৭ ভোট। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মভূমির এই আসনে ১৯৮৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা আটবার নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক প্রভাবের অবসান

১৯৮৪ সালে জেলা প্রতিষ্ঠার পর থেকে গোপালগঞ্জ ছিল আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র প্রভাবের কেন্দ্র। ১৯৯১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে জেলার তিনটি আসনেই নৌকার প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। বিশেষ করে গোপালগঞ্জ–৩ আসন দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে এবারের নির্বাচনে গোপালগঞ্জের ভোটারদের নতুন সিদ্ধান্ত জেলার রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে, যা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।