ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: নতুন সরকারের শপথ কে পড়াবেন?
নতুন সরকারের শপথ কে পড়াবেন?

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: নতুন সরকারের শপথ প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা

গতকাল বৃহস্পতিবার সারা দেশের ২৯৯টি আসনে অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা ৯ ঘণ্টা চলে এই ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া। রাতের মধ্যেই নির্বাচনি ফলাফল ঘোষণা করা হয়। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, বিএনপি সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।

শপথের সময়সীমা ও আনুষ্ঠানিকতা

সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সরকার গঠনের শুরু হবে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে। তবে এবারের শপথ প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে কিছু অনিশ্চয়তা। সাধারণত নির্বাচনের ফল ঘোষণার তিন দিনের মধ্যে শপথ পড়ানো হয়। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশন থেকে যে বেসরকারি ফলাফল একদিন বা দুইদিনের মধ্যে ঘোষণা করা হয়, তা আনুষ্ঠানিক ফলাফল হিসেবে গণ্য হয় না।

সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নির্বাচনের ফল ‘সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত’ হতে হবে এবং এরপর ‘তিন দিনের মধ্যে’ নির্বাচিতদের শপথ গ্রহণ হবে। অর্থাৎ, বেসরকারি ফলাফল ঘোষণার পর প্রজ্ঞাপন হতে আরো কয়েক দিন বাড়তি সময় লাগতে পারে, যা শপথের সময়সীমাকে প্রভাবিত করতে পারে।

শপথ পড়াবেন কে?

শপথ কে পড়াবেন এই প্রশ্নটি উঠছে, কারণ নিয়ম অনুযায়ী অতীতে নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়েছেন মূলত জাতীয় সংসদের স্পিকার। কিন্তু বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংসদ নেই, স্পিকারও নেই। এমনকি ডেপুটি স্পিকারও কারাগারে আছেন। এই অবস্থায় শপথ প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে?

সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে এই বিষয়ে দুটি উপায় বর্ণনা করা হয়েছে:

  • রাষ্ট্রপতি শপথ পাঠ করানোর জন্য কাউকে মনোনীত করতে পারেন।
  • যদি তিন দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি শপথ করাতে না পারেন, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে শপথ পাঠ করাবেন।

এ বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গত পাঁচই ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, নির্বাচনের পর দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায় সরকার। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে দুটি অপশন আছে। একটা হচ্ছে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করাতে পারেন, যেমন প্রধান বিচারপতি। আর এটা যদি না হয়, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ গ্রহণ করাবেন। তবে এ ক্ষেত্রে তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে, যা আমরা চাই না। আমরা যত দ্রুত সম্ভব শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে চাই।’

শপথের পর ক্ষমতা হস্তান্তর

শপথের বিষয়টি সমাধান হয়ে গেলেও আরো কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। ক্ষমতা কে, কীভাবে পাবেন, অর্থাৎ সরকার গঠন কে করবেন? এই প্রক্রিয়াটি হবে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে। তিনি যে দল বা জোট এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতেছে, অর্থাৎ ১৫১টি বা তার বেশি আসনে জয়ী হয়েছে, তাকেই সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানাবেন।

সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদে বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে: ‘যে সংসদ-সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হইবেন, রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন।’ মূলত, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীসভার সদস্যরা শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ওই পদগুলোর ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেয়ে যাবেন। এর মধ্য দিয়েই আগের সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়ে নতুন সরকার গঠিত হবে।

সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে আরো বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধানের অধীন যে ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির পক্ষে কার্যভার গ্রহণের পূর্বে শপথগ্রহণ আবশ্যক, সেই ক্ষেত্রে শপথগ্রহণের অব্যবহিত পর তিনি কার্যভার গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।’ অর্থাৎ, শপথগ্রহণ হয়ে গেলেই তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বলে গণ্য হবে।

এই নির্বাচন ও শপথ প্রক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে প্রভাবিত করতে পারে।