কুড়িগ্রামে জাতীয় পার্টির দুর্গ ভেঙে পড়ল, চার আসনেই শূন্য হাত
দলের ঐতিহ্যবাহী ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত কুড়িগ্রামে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থীরা একেবারেই ধ্বসে পড়েছেন। জেলার চারটি সংসদীয় আসনের প্রতিটিতে লাঙ্গল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কোনোটিতেই বিজয়ী হতে পারেননি তারা। বরং চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতেই জামানত হারিয়েছেন দলটির প্রার্থীরা, যা দলের জন্য একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
জামানত হারানোর শর্ত ও প্রক্রিয়া
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনও প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকায় প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ বা সাড়ে ১২ শতাংশ ভোট পেতে হয়। অন্যথায় জামানত বাবদ জমা দেওয়া টাকা বাজেয়াপ্ত হয়। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় প্রতিটি প্রার্থীকে ৫০ হাজার টাকা জামানত জমা দিতে হয়েছে। কুড়িগ্রামের বেশিরভাগ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা এই ন্যূনতম ভোটের সীমা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
কুড়িগ্রাম-১: সাবেক এমপির পরাজয় ও জামায়াতের উত্থান
কুড়িগ্রাম-১ আসনে (ভূরুঙ্গামারী ও নগেশ্বরী) জাতীয় পার্টির পাঁচ বারের সাবেক এমপি একেএম মোস্তাফিজুর রহমান দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হলেও এবার তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন। তিনি মাত্র ৫০,৭২৭ ভোট পেয়েছেন। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আনোয়ারুল ইসলাম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১,৪১,০৯০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপি প্রার্থী সাইফুর রহমান রানা ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১,২৩,০২৫ ভোট।
কুড়িগ্রাম-২: জাপার ঐতিহ্যবাহী আসন হাতছাড়া
কুড়িগ্রাম-২ আসন (সদর, রাজারহাট ও ফুলবাড়ী) জাতীয় পার্টির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু এবার তা হাতছাড়া হয়েছে। জাপা প্রার্থী সাবেক এমপি পনির উদ্দিন আহমেদ মাত্র ১৩,৮৪৬ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন। জামানত রক্ষার জন্য তার ৫০,৪৫৩ ভোট প্রয়োজন ছিল। এই আসনটি এবার চলে গেছে জামায়াত সমর্থিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দখলে। এনসিপি প্রার্থী ড. আতিকুর রহমান মোজাহিদ শাপলা কলি প্রতীকে ১,৮০,৫২৬ ভোট পেয়েছেন।
কুড়িগ্রাম-৩ ও ৪: বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজয়
কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আব্দুস সোবহান মাত্র ২,১১২ ভোট পেয়েছেন, যেখানে জামানত রক্ষার জন্য ২৮,৪৯১ ভোট প্রয়োজন ছিল। এই আসনে জামায়াত প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহী ১,০৭,৯৩০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন।
কুড়িগ্রাম-৪ (চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর) আসনেও একই দৃশ্য দেখা গেছে। জাপা প্রার্থী কে এম ফজলুল মন্ডল মাত্র ২,১৮০ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন। এই আসনে জামায়াত প্রার্থী মো. মোস্তাফিজুর রহমান ১,০৮,২১০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন, যেখানে তার বড় ভাই ও বিএনপি প্রার্থী মো. আজিজুর রহমান ৮৪,৪২৩ ভোট পেয়েছেন।
নির্বাচন কর্মকর্তার বক্তব্য
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আলমগীর বলেন, ‘জামানত রক্ষার জন্য প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট আসনের প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ বা সাড়ে ১২ শতাংশ ভোট পেতে হবে। অন্যথায় তিনি জামানত হারাবেন।’ কুড়িগ্রামের চারটি আসনেই জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা এই শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন, যা দলের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে।
এই নির্বাচনে কুড়িগ্রামে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক প্রভাব মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। জামায়াত ও বিএনপির প্রার্থীরা দৃঢ়ভাবে আসনগুলো দখল করেছেন, যা আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
