১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন: গণতন্ত্রের পুনর্গঠনে একটি সম্ভাবনার দিন
গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অপরিহার্য, যা নাগরিক মর্যাদার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। ২০০৮ সালের পর দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে ক্ষমতার প্রকৃত পালাবদল ঘটেনি, যার ফলে একদলীয় প্রাধান্য এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটেছে। ইতিহাস প্রমাণ করে, যখন জনগণের ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পথ সংকুচিত হয়, তখন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রযন্ত্র নাগরিকের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে।
নির্বাচনের দ্বৈত মাত্রা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক পরিবর্তনের পর আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন এবং গণতন্ত্রকে সুসংহত করার প্রশ্ন একসঙ্গে সামনে এসেছে। অতীতে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটলেও গণতান্ত্রিক উপাদানগুলোর একীভূতকরণ নিশ্চিত করা যায়নি, ফলে নতুন করে গণতান্ত্রিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান একটি নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে, এবং এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, বরং গণতান্ত্রিক ভিত্তি পুনর্গঠনের একটি পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই নির্বাচনের দুটি মাত্রা রয়েছে: প্রথমত, এটি জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, যেখানে নাগরিকেরা ভোট দিয়ে তাঁদের পছন্দের রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় আনার সুযোগ পাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, এটি একধরনের গণ-অনুমোদন, যেখানে রাষ্ট্রকাঠামো ও রাজনৈতিক সংস্কারের প্রস্তাব জনগণের সমর্থন পাচ্ছে কি না তা যাচাই করা হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও ভোটার অংশগ্রহণ
নির্বাচনের দিনে কিছু বিচ্ছিন্ন অনিয়মের খবর এলেও, বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে কখনো শতভাগ স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু ভোট হয়েছে বলা যায় না। প্রশ্ন হলো, অনিয়মের মাত্রা কি সামগ্রিক ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে? এখন পর্যন্ত যে প্রবণতা দৃশ্যমান, তাতে বড় কোনো কারচুপির ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি, যা একটি ইতিবাচক দিক।
ভোটার উপস্থিতির প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নির্বাচন শুধু অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলেই চলবে না, সেটি অংশগ্রহণমূলকও হতে হবে। নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি, যা ভোট গ্রহণের হারে প্রভাব ফেলেছে। তবে প্রাথমিক হিসাব বলছে, ভোটার উপস্থিতি ৬০ শতাংশের কাছাকাছি বা কিছুটা বেশি হতে পারে, যা একটি বড় রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ না থাকা সত্ত্বেও পুরোপুরি নিরাশাজনক নয়।
নির্বাচন পরবর্তী চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
কোনো সহিংসতা ছাড়া ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনী দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে। ভোট গ্রহণের দিন রাজনৈতিক দলগুলো যে স্বতঃস্ফূর্ততা, ধৈর্য ও সংযম দেখিয়েছে, আশা করা যায় ভোটের ফলাফল নিয়েও তারা একই মনোভাবের পরিচয় দেবে।
ফলাফল যা–ই হোক, দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। নতুন প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও কার্যকর ভূমিকার সুযোগ দিতে হবে, এবং বিরোধী দলকেও উপলব্ধি করতে হবে যে গণতান্ত্রিক উত্তরণ একটি যৌথ প্রক্রিয়া।
এই নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত আছে গণভোটের প্রশ্ন, যা ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে রাষ্ট্র সংস্কারের একটি সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করবে। জুলাই সনদে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের বিধান, এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপদ্ধতির সংস্কারের মতো প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
ভবিষ্যতের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
প্রথম চ্যালেঞ্জ: নতুন সরকারের সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে গণভোটের রায়ের প্রতি নিঃশর্ত সম্মান প্রদর্শন। জনগণ যদি রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে স্পষ্ট রায় দেয়, তবে তা বাস্তবায়নে গাফিলতি করলে সরকারের প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ন হবে।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ: প্রশাসন বা আমলাতন্ত্রের সংস্কার অপরিহার্য, কারণ গত দেড় দশকে আমলাতন্ত্রে ব্যাপক রাজনীতিকরণ হয়েছে। মেধাভিত্তিক পেশাদারির পরিবর্তে আনুগত্যনির্ভর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা প্রশাসনের মনোবল ও নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ: নাগরিক সমাজের পরিসর পুনর্গঠন জরুরি, কারণ গণতন্ত্রে সিভিল সোসাইটি কেবল সমালোচক নয়, বরং জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়ক। সরকারকে সমালোচনার সুযোগ দিতে হবে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, এবং নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ: অর্থনীতি আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ, যেখানে বিনিয়োগ ঘাটতি রয়ে গেছে। বেসরকারি বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনা, আর্থিক খাতের সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি রক্ষা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি আগামী সরকারের জন্য অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন একটি রাজনৈতিক সম্ভাবনার দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে জনগণ তাদের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে। এখন দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের, যাঁরা যদি এই সুযোগকে সম্মিলিত রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করতে পারেন, তবে গণতন্ত্রের পথে আমরা দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারব।
আসিফ মোহাম্মদ শাহান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকমতামত লেখকের নিজস্ব