রংপুরে নির্বাচনে ৬ স্তরের নিরাপত্তা, ঝুঁকিতে ২৫৬১ কেন্দ্র
রংপুর বিভাগে আগামী গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ৬ স্তরের নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কেন্দ্রগুলোতে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারির পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের শরীরে বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে, যা ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে লাইভ মনিটরিং করা সম্ভব হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের বিস্তারিত তথ্য
রংপুর বিভাগের ৩৩টি সংসদীয় আসনে মোট এক কোটি ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫৬ ভোটারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে চার হাজার ৫৪৬টি ভোটকেন্দ্র। তবে প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে দুই হাজার ৫৬১টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো, এই ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৮২৭টি অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো মূলত চরাঞ্চল, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকা এবং কিছু প্রার্থীর বাড়ির নিকটবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, এসব কেন্দ্রে অতীতে ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা, সংঘর্ষ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। এই ইতিহাসের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তারিত
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ইতিমধ্যে সিসি টিভি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শুরু করা হয়েছে। এছাড়া, বাড়তি অস্ত্রধারী পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। ভিজিলেন্স টিম এবং স্ট্রাইকিং ফোর্সও সক্রিয় থাকবে। রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম জানান, প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে এবং পুলিশ সদস্যদের বডিওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হবে।
জেলা পুলিশ সুপার মারুফাত হুসাইন মঙ্গলবার এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করতে জেলা পুলিশের আওতাধীন ৬৬৯টি কেন্দ্রে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কেন্দ্রের বাইরে ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স, সাব সেক্টর ও সেক্টর ভাগ করে ভোটার, ভোট প্রত্যাশী এবং নির্বাচনে ব্যবহৃত সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ৩১৫টি কেন্দ্রে পুলিশের কাছে বডিওর্ন ক্যামেরা থাকবে।
অন্যান্য বাহিনীর ভূমিকা
নির্বাচনের মাঠে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, আনসারসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করবে। সেনাবাহিনীর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডো গ্রুপ রংপুরে যে কোনো ধরনের উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রস্তুত রয়েছে। নির্বাচনের দিন প্রত্যন্ত এলাকার কোনো কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা ঘটলে তারা হেলিকপ্টার ড্রপ করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবেন।
বিজিবির রংপুর সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল এসএম শফিকুর রহমান জানান, রংপুর বিভাগের চার জেলায় তিন হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এই জেলাগুলো হলো রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা। ২৬টি বেজ ক্যাম্পে ৭৪ প্লাটুন বিজিবি সদস্য নির্বাচনি এলাকার নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা, চেকপোস্ট স্থাপন এবং মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে।
ভোটার ও প্রার্থীর পরিসংখ্যান
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসানের দেওয়া তথ্য অনুসারে, রংপুর জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০২ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১৩ লাখ ৬ হাজার ৩৩৩ জন এবং পুরুষ ভোটার ১২ লাখ ৯২ হাজার ৮৩৮ জন। হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৩১ জন। জেলায় মোট ৮৭৩টি কেন্দ্রে ৪,৯৮৮টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলে ৪৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরপিএমপি) জানিয়েছে, জেলার ৬টি সংসদীয় আসনের ৩টি আসনের আংশিক অংশে তাদের দায়িত্ব থাকবে। এসব স্থানের ২০৪টি কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনসহ ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে আলাদা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া, নির্বাচনি দায়িত্বে ৩০টি মোবাইল পেট্রোল টিম ও ৭৮টি স্ট্রাইকিং রিজার্ভ ফোর্স কাজ করবে।
জেলা পুলিশ সুপার মারুফাত হুসাইন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, রংপুর জেলার নির্বাচনি পরিবেশ অত্যন্ত ভালো এবং এখন পর্যন্ত কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি। ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে যেতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট সকল বাহিনী।
