ফেনী-২ আসনে নির্বাচনী উত্তাপ চরমে: ঈগল বনাম ধানের শীষ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-২ আসনে ভোটের উত্তাপ চরম আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। জেলা সদরের এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত হলেও এবার জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ঈগল প্রতীক নিয়ে পরিবর্তনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তৃণমূল থেকে শহর পর্যন্ত ঈগলের বাতাস বইতে শুরু করেছে, যা নির্বাচনী সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ভোটার সংখ্যা ও প্রার্থীদের তালিকা
নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফেনী-২ আসনে মোট ভোটার রয়েছেন ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২৫ হাজার ৮৮১ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ১১ হাজার ১৯৪ জন এবং হিজড়া ভোটার ৩ জন। কাগজে-কলমে ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল লড়াই হবে ধানের শীষ ও ঈগল প্রতীকের মধ্যে।
অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন:
- মাওলানা একরামুল হক ভুঞা (হাতপাখা)
- তারেকুল ইসলাম ভুঞা (ট্রাক)
- মো: হারুনুর রশিদ ভুঞা (রিক্সা)
- সামছুদ্দিন মজুমদার সাচ্চু (তাঁরা)
- জসিম উদ্দিন (কাঁচি)
- সাইফুল করিম মজুমদার (প্রজাপতি)
- মোহাম্মদ আবুল হোসেন (বটগাছ)
- তাহেরুল ইসলাম (ডাব)
প্রচারণার শেষ দিনে গণমিছিল ও উত্তেজনা
প্রচারণার শেষ দিনে মঙ্গলবার সকালে ধানের শীষ ও সন্ধ্যায় ঈগলের পক্ষে বড় আকারের গণমিছিল হয়েছে। উভয় পক্ষই মাইকিং, গণসংযোগ, পথসভা এবং উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সমানতালে প্রচারণা চালিয়েছেন। তবে ঈগল প্রতীকের প্রতি তরুণ ও ছাত্রদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মজিবুর রহমান মঞ্জু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সামনের সারিতে থাকায় তার পক্ষে তরুণরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন।
এদিকে, ঈগলের গণমিছিলের আগের দিন মঞ্জুর নিজ ইউনিয়ন শর্শদী বাজারে জামায়াত কর্মীর দোকান থেকে ব্যানার-পোস্টার লাগানোর পাইপ আটকের ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। এই আসনের এমপি জেলার নিয়ন্ত্রক হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
ফেনী-২ আসনে তিনবার সংসদ সদস্য ছিলেন ধানের শীষের প্রার্থী অধ্যাপক জয়নাল আবদীন ভিপি। তার বিপরীতে আওয়ামী লীগ বাকি সব নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। ২০১৪ সালে বিনা ভোটে, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে একতরফা ভোটে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারী সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। ভোটের হিসেবে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও এবার জামায়াত জোটের কারণে সমীকরণ ভিন্ন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অভিযোগ, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ভিপি জয়নালের সরাসরি ভূমিকা সীমিত ছিল এবং নেতাকর্মীদের আপদে-বিপদে তাকে পাওয়া যায়নি। বয়সজনিত কারণেও তিনি অনেকটা নিষ্ক্রিয় বলে অভিযোগ ওঠে। তবে মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি নেতাকর্মীদের সাথে দূরত্ব কমানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।
১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা দাবি করেন, ভিপি জয়নাল তিনবার এমপি থাকলেও ফেনীর উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেননি। ফলে ভোটাররা এবার নতুন মুখের দিকে ঝুঁকতে পারেন, বিশেষ করে নতুন ও নারী ভোটাররা পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
দলীয় বক্তব্য ও আশাবাদ
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, "সব মান-অভিমান ভুলে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছেন। আমরা আশাবাদী, রেকর্ড ভোটে বিএনপি জয়ী হবে।"
জেলা জামায়াতের আমির মুফতি আবদুল হান্নান জানান, "কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মজিবুর রহমান মঞ্জুর ঈগল প্রতীকের পক্ষে সর্বাত্মকভাবে কাজ করছি। আমাদের দলে আর কোনো গ্রুপিং নেই। ভোটাররা এবার প্রতীক নয়, সৎ, যোগ্য ও দক্ষতা বিবেচনায় ভোট দেবেন।"
রাজনীতির পুরোনো খেলোয়াড় ভিপি জয়নালও শেষ পর্যন্ত লড়াই ছাড়ছেন না। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আরেকটি বিজয়ের আশায় তিনি মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। পাশাপাশি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকও জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
