রাজশাহী-১ আসনে নির্বাচনী প্রচারণা: মাদক ও পানিসংকট ভোটারদের প্রধান চিন্তা
রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-১ সংসদীয় আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা বেজে উঠেছে। তবে এই উত্তর জনপদের প্রায় ৪ লাখ ৬৮ হাজার ভোটারের মনোযোগ এখন দুটি গভীর সংকটে নিবদ্ধ: অবাধ মাদকের কারবার এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির মারাত্মক সংকট। যুগ যুগ ধরে এই দুই সমস্যায় জর্জরিত সাধারণ মানুষ এবার প্রার্থীদের কাছ থেকে কেবল মিষ্টি বুলি নয়, বরং দৃশ্যমান ও টেকসই পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি চাইছেন।
গোদাগাড়ী সীমান্তে মাদকের অবাধ প্রবাহ: স্থানীয়দের তীব্র ক্ষোভ
গোদাগাড়ী উপজেলার সীমান্ত দিয়ে বানের পানির মতো হেরোইন ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য দেশে প্রবেশ করছে বলে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ। এই অবৈধ কারবারে জড়িত হয়ে অনেকেই রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক বা ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ' হয়ে উঠলেও, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিষিয়ে তুলেছে মাদকের এই স্রোত। গোদাগাড়ী পৌরসভার বাসিন্দা আসগার আলী বলেন, ‘এখান দিয়ে যে পরিমাণ হেরোইন আসে, তা দেশের আর কোথাও আসে না। ধরা পড়ে শুধু গরিব বহনকারীরা, কিন্তু গডফাদাররা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন।' গোদাগাড়ী স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালাহউদ্দীন বিশ্বাস আরও তীব্র ভাষায় অভিযোগ করেন, 'রাজনৈতিক নেতারা মাদক ব্যবসায়ীদের টাকা নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালান বলেই মাদক নির্মূল হয় না।'
বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকট: কৃষকদের অস্তিত্ব সংকট
অন্যদিকে, তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষকদের প্রধান দুশ্চিন্তা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়া। তানোরের এক কৃষক মইদুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, 'হাতে চাপাকলে পানি ওঠে না, কৃষিকাজের পানিও পাই না। ১৮০ ফুট গভীরেও পানি পাওয়া যায় না। ভোটের আগে সবাই সমাধান দেবে বলেন, কিন্তু পরে কেউ কথা রাখেন না।' সম্প্রতি সরকার বরেন্দ্র অঞ্চলে শুধু খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া একটি গেজেট প্রকাশ করেছে। এই নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করে তানোরের মুণ্ডুমালার কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, ‘পাতালে পানি নেই, এ জন্য সরকার এমন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কিন্তু আমরা পানি না তুললে চাষাবাদ করব কীভাবে? খাব কী? যারাই এখন আমাদের এলাকার এমপি হবেন, তার কাছে দাবি—সমস্যার যেন সমাধান হয়।'
প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি ও ভোটারদের সতর্ক বিশ্লেষণ
এই আসনে এবার চার জন প্রার্থী থাকলেও মূল আলোচনা বিএনপি ও জামায়াতের দুই প্রার্থীকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন। তার বড় ভাই ব্যারিস্টার আমিনুল হক এই আসনে তিন বার এমপি ছিলেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন দলটির কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, যিনি ১৯৮৬ সালে এই আসন থেকে একবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন এই আসনটি আওয়ামী লীগের ওমর ফারুক চৌধুরীর দখলে ছিল।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন বলেন, ‘আমার ভাইয়েরা বরেন্দ্র প্রকল্প ও পানি সংকট নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন কিন্তু শেষ করতে পারেননি। আমি নির্বাচিত হলে গডফাদারদের ধরে মাদক নির্মূল করব এবং ভূ-উপরিস্থ পানির আধার তৈরি করে কৃষকদের সেচসুবিধা দেব।' অন্যদিকে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তিনি নির্বাচিত হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে মাদকের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেবেন। তার পক্ষে প্রচারণায় তার চাচাত ভাই এবং রাজশাহী জেলা আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি ড. মো. ওবায়দুল্লাহ বলেন, 'আমরা নির্বাচিত হলে পদ্মার পানির হিস্যা আদায়ে ভারতের ওপর চাপ দেব, যাতে বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির স্তর স্বাভাবিক হয়। অপারেটর নিয়োগে কোনো পেশিশক্তি বা স্বজনপ্রীতি থাকবে না।'
নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, গোদাগাড়ী ও তানোরের সাধারণ মানুষ ততই সতর্কভাবে প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড ও বর্তমান প্রতিশ্রুতিগুলো বিশ্লেষণ করছেন। মাদক আর পানিশূন্যতার এই দীর্ঘস্থায়ী অভিশাপ থেকে কে মুক্তি দিতে পারবে, তা যাচাই করেই ১২ ফেব্রুয়ারি নিজেদের রায় দেবেন এই আসনের ৪ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি ভোটার।
