ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে রংপুরের ৬টি আসনে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী মঙ্গলবার সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা বন্ধ থাকলেও, ভোটের মাঠে এখনও চলছে নীরব লড়াই। চায়ের দোকান, খাবারের স্টল এবং প্রতিবেশীদের বাড়িতে গল্পের ছলে ভোটের প্রচারণা থেমে নেই। স্থানীয় ভোটারদের সাথে আলাপচারিতায় উঠে এসেছে, রংপুরের ৩টি আসনে ত্রিমুখী এবং বাকি ৩টি আসনে দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র।
রংপুরের আসনভিত্তিক বিশ্লেষণ
ভোটারদের মাঝে চলমান আলোচনা এবং স্থানীয় পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রংপুরের প্রতিটি আসনে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা জোরদার হয়েছে। প্রার্থীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং দলীয় অবস্থান ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকা চায়ের দোকানগুলোতে ভোটের হিসাব-নিকাশের ধুম পড়েছে। প্রার্থীদের পক্ষের কর্মীরা এসব দোকানের বিল পরিশোধ করছেন, যা ভোটের মৌসুমে এক অনন্য দৃশ্য তৈরি করেছে।
রংপুর-১ আসন: দ্বিমুখী লড়াইয়ে জামায়াতের সুবিধা
গংগাচড়া-সিটি আংশিক নিয়ে গঠিত রংপুর-১ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় মূলত দ্বিমুখী লড়াই দেখা যাচ্ছে। বিএনপির প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোকাররম হোসেন সুজন এবং জামায়াতের অধ্যাপক রায়হান সিরাজী শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তবে, বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের কারণে জাতীয় পার্টির সমর্থকরা ক্ষুব্ধ, যা জামায়াত প্রার্থীর জন্য ইতিবাচক বলে মনে করা হচ্ছে। স্থানীয় ভোটারদের মতে, এই আসনে জামায়াত প্রার্থীর জয়লাভের সম্ভাবনা প্রবল।
রংপুর-২ আসন: ত্রিমুখী সংঘর্ষে জাতীয় পার্টি এগিয়ে
তারাগঞ্জ-বদরগঞ্জ নিয়ে গঠিত রংপুর-২ আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী সরকার, জামায়াতের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম এবং জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য আনিসুল ইসলাম মণ্ডল ত্রিমুখী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন, যা ভোটারদের মাঝে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আনিসুল ইসলাম মণ্ডল এগিয়ে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রংপুর-৩ আসন: জাতীয় পার্টির দৃঢ় অবস্থান
এই আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী জিএম কাদের, বিএনপির সামসুজ্জামান এবং জামায়াতের মাহবুবুর রহমান বেলালের মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ожидается। স্থানীয় ভোটারদের মতে, জাতীয় পার্টির প্রার্থী জিএম কাদেরের পক্ষেই ভোটের হাওয়া বেশি, এবং তার জয়লাভের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।
রংপুর-৪ আসন: তীব্র ত্রিমুখী প্রতিযোগিতা
পীরগছা-কাউনিয়া নিয়ে গঠিত রংপুর-৪ আসনে বিএনপির এমদাদুল হক ভরসা, জামায়াত জোটের এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এবং জাতীয় পার্টির সাবেক পীরগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান আবু নাসের শাহ মাহবুবার রহমান সমানে সমান এগিয়ে আছেন। এই আসনে তীব্র ত্রিমুখী লড়াই হবে বলে আভাস মিলেছে, তবে জাতীয় পার্টির প্রার্থী তার উপজেলায় ভোটার সংখ্যা বেশি হওয়ায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
রংপুর-৫ আসন: দ্বিমুখী লড়াইয়ে জামায়াতের প্রাধান্য
মিঠাপুকুর নিয়ে গঠিত রংপুর-৫ আসনে বিএনপি প্রার্থী গোলাম রব্বানী, জামায়াতের অধ্যাপক গোলাম রব্বানী এবং জাতীয় পার্টির ফখর উজ জামান জাহাঙ্গির প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে বিএনপির রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ায় মূলত জামায়াত ও জাতীয় পার্টির মধ্যে দ্বিমুখী লড়াই দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়রা মনে করেন, জামায়াত প্রার্থীর জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি।
রংপুর-৬ আসন: বিএনপির সম্ভাব্য বিজয়
পীরগঞ্জ নিয়ে গঠিত রংপুর-৬ আসনে বিএনপির সাইফুল ইসলাম, জামায়াতের মওলানা মোহাম্মদ নুরুল আমিন এবং জাতীয় পার্টির নূর আলম যাদু মিয়া প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। ভোটের দৌড়ে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থী এগিয়ে আছেন, তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপির সাইফুল ইসলামের পক্ষে ভোটের জোয়ার আসছে বলে মনে করা হয়।
সার্বিকভাবে, রংপুরে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন জোরদার প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় পর্যায়ের আলোচনা নির্বাচনী ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।
