মেঘনার চরে নির্বাচনী উৎসব ও অবহেলার দীর্ঘশ্বাস
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের বেশিরভাগ মানুষ মেঘনা নদীর চরাঞ্চলে বসবাস করেন। নদীর বুকে জেগে ওঠা এই চরে বছরের পর বছর ধরে কয়েক হাজার মানুষের আবাস। তবে এখানে টিকে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয় চরবাসীদের। নদী ভাঙন, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব এবং অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা এখানকার প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও ভোটের পরের বাস্তবতা
নির্বাচনের সময় বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে নতুন স্বপ্ন বোনেন চরের বাসিন্দারা। কিন্তু ভোটের পর এলাকার চিত্র বদলায় না বললেই চলে। ভোট আসে, সরকার বদলায়, কিন্তু মেঘনার চরের বাসিন্দাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। স্থানীয়রা জানান, প্রার্থীরা উন্নয়নের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে রাস্তাঘাট, হাসপাতাল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নতি দেখা যায় না।
দুর্গম যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
রায়পুর শহর থেকে পৃথকভাবে সিএনজি চালিত অটোরিকশায় যেতে হয় মোল্লারহাট, হাজিমারা, চান্দারকাল ও সাজু মোল্লার মাছ ঘাটে। এরপর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ৩০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে হয়। বর্ষার ভরা মৌসুমে সময় কিছুটা কম লাগে, কারণ তখন নৌকা সোজাসুজি আসতে পারে। চর থেকে সমতলে আসা-যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম এই নৌকা। উত্তর চরবংশী ও দক্ষিণ চরবংশি ইউনিয়নের মেঘনার চরে যাতায়াতের জন্য পাকা কোনো সড়ক নেই। সরু রাস্তায় চলাচলের একমাত্র মাধ্যম মোটরসাইকেল। ফসল আনা-নেওয়ার কাজে কিছু ট্রলি গাড়ি চলাচল করে। নৌকায় নদী পার হওয়ার পর হেঁটেই গন্তব্যে পৌঁছাতে হয় বাসিন্দাদের।
স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সংকট
চরাঞ্চলের মানুষ আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা পান না তারা। এই ক্লিনিক বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ থাকে। কেউ অসুস্থ হলে প্রথমে মোটরসাইকেলযোগে নৌকাঘাট, তারপর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় মোল্লারহাট বাজারে নিয়ে সদর বা রায়পুরে যেতে হয়। বাসিন্দাদের দাবি, চরে অন্তত একটি আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন করা হোক।
শিক্ষাখেত্রেও রয়েছে বড় সংকট। উত্তর চরবংশী ও দক্ষিণ চরবংশি ইউনিয়নে প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও হাইস্কুল থাকলেও কোনো কলেজ নেই। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে পড়তে হলে এখানকার ছেলে-মেয়েদের নদী পার হয়ে অন্য অঞ্চলের কলেজে যেতে হয়। এই সংগ্রামী জীবনে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। স্থানীয় সচেতন মহল চরাঞ্চলে কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত
দক্ষিণ চরবংশি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, "নির্বাচন খুব সুন্দরভাবে হবে, এ ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। আমাদের পল্লী অঞ্চলের লোকজন খুবই শান্তিপ্রিয়। আওয়ামী লীগ আসলেও আমরা যেভাবে থাকি, বিএনপি আসলেও সেভাবে থাকি। আমাদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। মানুষের মধ্যে ভোটের আমেজ আছে।" তিনি আরও যোগ করেন, "আমাদের এখানে কলেজ থাকা প্রয়োজন। দুর্গম এলাকা আর নদী ভাঙনের কারণে এসব হয় না। একটি আধুনিক হাসপাতাল খুবই প্রয়োজন।"
মিয়ারহাট বাজারের দোকানি সজল হোসেন বলেন, "নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনে পর্যাপ্ত উৎসাহ আছে। এটি দুর্গম চরাঞ্চল। কোনো রোগীকে হাসপাতালে নিতে হলে অটোরিকশায় নিতে হয়। অনেক সময় তাও পাওয়া যায় না। সরকার যদি চরাঞ্চলের মানুষদের সুযোগ-সুবিধা দিত, আমাদের অনেক উপকার হতো।"
সত্তরোর্ধ্ব কৃষক আবদুল মজিদের ভাষায়, "যদি সুষ্ঠুভাবে ভোট হয়, যাব; নইলে যাব না। চেয়ারম্যান-মেম্বারের কাছ থেকে কোনো অনুদান আসে না। এলাকার কোনো সমস্যারই সমাধান হয় না। রাস্তাঘাট হয় না।"
নারীদের সংগ্রামী জীবন
জীবন এখানে কতটা সংগ্রামের, তার দেখা মেলে এখানকার নারীদের দৈনন্দিন রুটিনে। ঘরের কাজ সামলে তারা মাঠের কাজেও সমান পারদর্শী। মিয়ারহাট ও চান্দারখাল এলাকায় দেখা মিলল পাঁচজন নারীর। তাদের স্বামীরা সবাই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। ঘরের কাজ শেষে পাঁচজনই বের হয়েছেন গবাদিপশুর জন্য ঘাস কাটতে। সবিতা বেগম নামের এক নারী বলেন, "আমাদের এলাকায় নদীতে বাঁধ দেওয়া লাগবে। আমাদের বছর বছর বাড়িঘর ভাঙে। আমাদের চলাফেরার কষ্ট হয়। আসে শুধু ভোট চায়, কিছু করে দেবার চায় না।"
প্রশাসনের প্রস্তুতি ও চ্যালেঞ্জ
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান কাউছার জানান, লক্ষ্মীপুর-২ আসনে ১১৫টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে দুর্গম চরে আছে ৩৮টি ভোটকেন্দ্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে ইতোমধ্যে সব ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করা হয়েছে। তিনি বলেন, "স্থলের বাইরের কেন্দ্রগুলো দুর্গম হওয়ায় আমাদের নদীপথ, অটো গাড়ি ও পায়ে হেঁটে যেতে হয়। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আইনবিধি এবং নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা আমাদের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছি।" দুর্গম চরাঞ্চলই মূল চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
চর জালিয়া এলাকায় সয়াবিন রোপণের কাজ করা ৬৫ বছর বয়সি আবদুর বাছেদের কথায়, "আমাদের এই এলাকা দুর্গম জায়গা। যে ব্যাপারীই আসুক, তার নৌকা খরচা-গাড়ি খরচা এগুলো রাখে। আমাদের কম দামেই বিক্রি করতে হয়। এখানে সবাই কৃষিকাজ করে, অন্য কোনো পেশা নেই।"
প্রায় ২৫ বছর ধরে নির্বাচনকালীন গ্রামপুলিশ সদস্যের দায়িত্ব পালনকারী মোঃ নুরুল ইসলাম বলেন, "সবাই বলছে, অনেক দিন ভোট দিতে যেতে পারি না। এখন আমাদের মনে আনন্দ, ভোট দিতে যাব। যার যেখানে মনে চাইবে, সে সেখানে ভোট দিবে। আগে তো ভোটই হতো না, আগে রাতেই ভোট শেষ। সবাই বলছে এবারই সিস্টেম ভালো।"
মেঘনার চরের এই জীবনযুদ্ধ শুধু ভোটের সময়ই আলোচনায় আসে, কিন্তু উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে এখনও বহু দূরে এই সম্প্রদায়। প্রকৃতির সৌন্দর্য আর কঠিন জীবনের এই দ্বন্দ্ব যেন অনন্তকাল চলমান এক সংগ্রামের ইতিহাস।
