সিলেট-৫ আসনে ত্রিমুখী হাড্ডাহাড্ডি লড়াই: শেষ মুহূর্তে জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ
ভোটগ্রহণের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সিলেট-৫ আসনে ভোট রাজনীতির সমীকরণ জটিল থেকে জটিল হয়ে নাটকীয় রূপ নিচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র একদিন বাকি থাকায় জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে উত্তেজনা চরমে। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে সাতটা থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা বন্ধ হলেও মাঠে উত্তেজনা একটুও কমেনি। প্রার্থী ও তাদের সমর্থকেরা নীরব কৌশল আর অঙ্ক কষায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
ভোটার সংখ্যা ও প্রার্থীদের তালিকা
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই উপজেলা মিলিয়ে এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২৮ হাজার ৭৪৬ জন। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন:
- বিএনপি-জমিয়ত জোট মনোনীত প্রার্থী বাংলাদেশ উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক (খেজুর গাছ প্রতীক)
- ১১ দলীয় জোট মনোনীত খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান (দেওয়াল ঘড়ি প্রতীক)
- বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদ চাকসু মামুন (ফুটবল প্রতীক)
- বাংলাদেশ মুসলিমলীগ মনোনীত প্রার্থী মো. বিলাল উদ্দিন (হারিকেন প্রতীক)
মাঠপর্যায়ের বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, বিএনপি-জমিয়ত জোটের প্রার্থী, জামায়াত জোটের প্রার্থী ও বিএনপি বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এ তিন প্রার্থীর মধ্যে কেউই একচেটিয়া সুবিধাজনক অবস্থানে নেই।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রভাব
এ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক বিএনপির সমর্থন, জমিয়তের সাংগঠনিক ভোট এবং কওমি ঘরানার বড় একটি অংশের ওপর ভরসা রাখছেন। কিন্তু জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশীদ ‘চাকসু মামুন’ দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ফুটবল প্রতীক নিয়ে পুরো নির্বাচনেই নতুন মেরুকরণ ঘটিয়েছেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হলেও ভোটের মাঠে এতে প্রভাব কমেনি। জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটের বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে কিংবা নীরবে তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।
সোমবার রাতে জকিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুর রহমান, জকিগঞ্জ সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি শাব্বির আহমদ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তাওহীদ হাসান তানিমকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর আগে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন সেলিম, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কামরুল ইসলাম, জকিগঞ্জ পৌরসভা বিএনপিসহ উপজেলা পর্যায়ের অঙ্গ সংগঠনের একাধিক নেতা এবং কানাইঘাট উপজেলার কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিস্কৃত নেতাকর্মীদের মতে, বারবার জোটের প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়ায় তৃণমূলে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমেছিল, যা এবারের নির্বাচনে বিস্ফোরিত হয়েছে।
জামায়াত জোটের প্রার্থীর শক্ত অবস্থান ও কওমি ভোটের বিভাজন
অন্যদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান দেওয়াল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। তার বড় পুঁজি কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ভোটের বড় একটি অংশ, জামায়াতের ভোট ব্যাংক ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। বিশেষ করে জকিগঞ্জ উপজেলায় নিজ এলাকার ভোট এবং কওমি অঙ্গনের সমর্থন তাকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। তবে নির্বাচনে কওমি ঘরানার দুই শীর্ষ আলেমের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ধর্মভিত্তিক ভোটব্যাংক বিভক্ত হয়েছে, যা বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীকে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়।
ফুলতলী পীরের ভোটব্যাংক: বড় অজানা ফ্যাক্টর
ত্রিমুখী লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় অজানা ফ্যাক্টর হিসেবে আলোচনায় রয়েছে আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী (ফুলতলী পীর সাহেব) অনুসারীগণের ভোটব্যাংক। সিলেট-৫ আসনে ফুলতলী কেন্দ্রীক ভোটের প্রভাব দীর্ঘদিনের। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ফুলতলী পীর সাহেবের ছেলে মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জয়ী হলেও এবার তিনি প্রার্থী নন। দলীয়ভাবেও আল ইসলাহ কাউকে সরাসরি সমর্থন দেয়নি। ফলে এই বিশাল ভোটব্যাংক আপাতত উন্মুক্ত থাকলেও শেষ মুহূর্তে কোনো এক সমীকরণে তারা নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। বিএনপি জোট, জামায়াত জোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সকলেই ফুলতলী ছাহেব বাড়িতে গিয়ে দোয়া ও সৌজন্য সাক্ষাতের মাধ্যমে নিজেদের পক্ষে ওই ভোট ব্যাংক টানার চেষ্টা করেছেন।
সংখ্যালঘু ও নীরব ভোটারদের সম্ভাব্য ভূমিকা
ফলাফলে সংখ্যালঘু ও নীরব ভোটাররাও বড় ভূমিকা রাখবেন। জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটে সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা খুব বড় না হলেও তারা সাধারণত একমুখী ভোট দিয়ে থাকেন এবং ফলাফলে প্রভাব রাখেন। সংখ্যালঘু একাধিক ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার একটি বড় অংশ দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও স্থানীয় সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যা স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদের দিকে ভোট ঝুঁকতে পারে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটারদের একটি অংশ নীরবে ভোট দিতে পারেন এমন গুঞ্জনও রয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতামত ও চূড়ান্ত সম্ভাবনা
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে জাতীয় পার্টি, সংখ্যালঘু ভোট, সাম্প্রদায়িক ভোটব্যাংক এবং নীরব ভোটারদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ফলাফলের হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। অদৃশ্য এই ভোটশক্তির সামান্য দিক পরিবর্তনেই সিলেট-৫ আসনে ঘটতে পারে নাটকীয় উত্থান-পতন। ভোটের দিন এই অদৃশ্য শক্তিগুলোই বলে দেবে শেষ হাসি কার মুখে। প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী, কিন্তু যিনিই বিজয়ী হন না কেন, তিনি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হবেন।
প্রশাসনও শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্র সিসি ক্যামেরা দ্বারা বেষ্টিত করা হয়েছে, তবুও ভোটারদের মনে নানা শঙ্কা রয়ে গেছে। ভোটারদের প্রত্যাশা সব শঙ্কা ছাপিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন, যা সিলেট-৫ আসনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
