খুলনা-১ আসনে চতুর্মুখী লড়াই: হিন্দু ভোটারই নির্ধারণ করবে জয়-পরাজয়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসনে ১২ জন প্রার্থী মাঠে নেমেছেন। ভোটারদের ধারণা, এই আসনে চতুর্মুখী লড়াই হবে। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের আমির এজাজ খান, ইসলামিক ফ্রন্টের মোমবাতি প্রতীকের সুনীল শুভ রায়, জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের কৃষ্ণ নন্দী এবং সিপিবির কাস্তে প্রতীকের কিশোর কুমার রায়ের মধ্যে। তবে জামায়াত প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী ছাড়া বাকি সবাই এই সংসদীয় আসনের স্থায়ী বাসিন্দা।
আসনের ভোটার ও জনসংখ্যার পরিসংখ্যান
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত দাকোপ-বটিয়াঘাটা দুটি উপজেলা ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত খুলনা-১ আসন। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ২ হাজার ৬৪৪ জন। এর মধ্যে দাকোপ উপজেলায় ভোটার আছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৭৭ জন।
সর্বশেষ জনশুমারি ২০২২ অনুযায়ী, দাকোপে মোট জনসংখ্যা ১ লাখ ৫৯ হাজার ৩৬৯। এর মধ্যে হিন্দু ৮৬ হাজার ৭৬৬ জন, মুসলিম ৬৯ হাজার ২১২ জন, খ্রিষ্টান ৩ হাজার ৩৮১ জন এবং অন্যান্য ১০ জন। হিসাব করলে মুসলিম ভোটার ৪৩.৪৩% এবং হিন্দু ভোটার ৫৪.৪৫%। সংখ্যালঘু সনাতন ধর্মের ভোটার সংখ্যা বেশি থাকায় এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত।
হিন্দু প্রার্থীদের তালিকা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এবারের নির্বাচনে সনাতন ধর্মের ভোটারদের লক্ষ্য করে হিন্দু প্রার্থী হয়েছেন মোট ৮ জন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
- জামায়াতের কৃষ্ণ নন্দী
- জেএসডির প্রসেনজিৎ দত্ত
- বাংলাদেশ মাইনোরিটি জাতীয় পার্টির প্রবীর গোপাল রায়
- বাংলাদেশ সমঅধিকার পরিষদের সুব্রত মণ্ডল
- বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কিশোর কুমার রায়
- বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রন্টের সুনীল শুভ রায়
- স্বতন্ত্র প্রার্থী গোবিন্দ হালদার
- স্বতন্ত্র প্রার্থী অচিন্ত্য কুমার মণ্ডল
আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার ভাগ বসাতে চাইছে বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা। স্থানীয় সূত্রমতে, আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে সবচেয়ে অভিজ্ঞ প্রার্থী হচ্ছেন বিএনপির আমির এজাজ খান। তার সঙ্গেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রধান প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচিতি ও অবস্থান
বিএনপির আমির এজাজ খান ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো খুলনা-১ আসনে দলের মনোনয়ন পান। তখন তিনি পেয়েছিলেন ৪৭ হাজার ৫২৩ ভোট। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তার ভোট বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৬৮ হাজার ৪২০। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি পান ২৮ হাজার ৩৩২ ভোট। প্রায় তিন দশকের রাজনৈতিক জীবনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি দাকোপ-বটিয়াঘাটা এলাকায় কাটিয়েছেন। তিনি বলেন, "আমি সবসময় মাঠেই ছিলাম, এখনো আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব। দাকোপ একটি ভাঙনকবলিত এলাকা যেখানে উন্নয়ন হয়নি। বটিয়াঘাটায় নামেমাত্র উন্নয়ন হয়েছে। সুযোগ পেলে জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণ করব।"
সিপিবির কিশোর কুমার রায় পূর্বে দাকোপ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। সিপিবির প্রার্থী হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, "জনগণ আমাকে বেছে নেবে।"
জামায়াতে ইসলামীর কৃষ্ণ নন্দী বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী। জামায়াত এই প্রথম ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে মনোনয়ন দিয়েছে, যা তাকে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে। এই আসনে জামায়াতের কিছু রিজার্ভ ভোট রয়েছে। হিন্দু ভোটারদের সমর্থন পেলে তার বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তবে তার বাড়ি ডুমুরিয়া উপজেলায় হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা না হওয়ার বিষয়টি কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসলামিক ফ্রন্টের সুনীল শুভ রায় বেশ পরিচিত মুখ। তিনি পূর্বে দুবার জাতীয় পার্টির হয়ে এই আসনে নির্বাচন করেছিলেন। এবার তিনি সম্মিলিত ইসলামিক ফ্রন্টের মোমবাতি প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। তিনি সাবেক জাতীয় পার্টি ও সাবেক মহাজোট গঠনের কারিগর ছিলেন বলে আওয়ামী লীগের সমর্থন তার দিকে আসতে পারে বলে সাধারণ মানুষের ধারণা।
অন্যান্য প্রার্থীদের অবস্থান
জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের জাহাঙ্গীর হোসেন মাঠে নামলেও ভিত্তি তৈরি করতে পারেননি। স্বতন্ত্র কলস প্রতীকের গোবিন্দ হালদার পূর্বে বিএনপির লোক ছিলেন, কিন্তু দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়িয়েছেন। ভোটাররা তাকে কতটা গ্রহণ করবে তা এখনো অনিশ্চিত।
ড. অচিন্ত্য কুমার মণ্ডল একজন শিক্ষিত ব্যক্তি ও চালনা পৌরসভার সাবেক মেয়র হলেও পেছনে কোনো দলীয় লেবেল না থাকায় ব্যক্তি ইমেজে কতদূর এগোতে পারবেন তা সময়ই বলবে। জেএসডির প্রসেনজিৎ দত্ত, গণঅধিকার পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী রোকনুজ্জামান এবং বাংলাদেশ মাইনোরিটি জনতা পার্টির প্রবীর গোপাল রায় নির্বাচন করলেও জনসংযোগেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছেন, তাদের তেমন প্রচার-প্রচারণা চোখে পড়ছে না।
খুলনা-১ আসনের এই নির্বাচনী লড়াইয়ে হিন্দু ভোটারদের সমর্থনই চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ৫৪.৪৫% হিন্দু ভোটারের রায়ই ঠিক করবে কে হবেন এই আসনের বিজয়ী।
