বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অপরাধ ও নিরাপত্তাহীনতা: করণীয় কী?
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অপরাধ ও নিরাপত্তাহীনতা: করণীয়

বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় নিরাপত্তাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দৈনিক পত্রিকা, অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলো দেখলে উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় থাকে না। খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিক ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়িয়ে তুলছে।

সর্বশেষ কক্সবাজারের ঘটনা

সর্বশেষ কক্সবাজারের মাতামুহুরী এলাকায় সংঘটিত একটি ঘটনা পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছে। গভীর রাতে একদল সশস্ত্র ডাকাত একজন প্রবাসীর বাড়িতে ঢুকে লুটপাট চালায়। এরপর গৃহবধূ ও তাঁর কিশোরী মেয়েকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, এটি আমাদের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতার নির্মম প্রতীক। এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে—এ ধরনের অপরাধীরা এতটা দুঃসাহস পায় কোথা থেকে?

সংখ্যায় অপরাধের চিত্র

এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই দেশে এক হাজারেরও বেশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। একই সময়ে শত শত অপহরণ, ছিনতাই ও প্রায় ছয় শতাধিক ডাকাতির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার সংখ্যাও কয়েক হাজার। শুধু চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত অন্তত ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পুলিশের তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ—মাত্র তিন মাসে সারা দেশে ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। রাজধানী ঢাকাতেই এই সময়ে ১০৭টি খুনের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। এমন পরিসংখ্যান কোনও স্বাভাবিক পরিস্থিতির নির্দেশক হতে পারে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা

এদিকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যাচ্ছে, কিছু সন্ত্রাসী দেশে গা-ঢাকা দিয়ে এবং কিছু শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্র বিদেশে অবস্থান করেও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে চাঁদা দাবি, হত্যার হুমকি এবং স্থানীয় সহযোগীদের ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে আলোচিত হচ্ছে। বাজার, পরিবহন খাত, জমি ব্যবসা এবং বিভিন্ন স্থানীয় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র সক্রিয় হওয়ার খবরও এসেছে।

প্রশ্ন: কেন এই পরিস্থিতি?

প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে? আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি কঠিন সত্য হলো—সন্ত্রাসীদের কোনও স্থায়ী রাজনৈতিক আদর্শ থাকে না। তারা সবসময় ক্ষমতার ছায়াতলে কোনও না কোনোভাবে অবস্থান নেয়। বাংলাদেশের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু অপরাধী গোষ্ঠীও তাদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেছে। ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে, কিন্তু অপরাধী চক্রের অনেকেই টিকে থেকেছে। ফলে অপরাধীকে দলীয় পরিচয়ে নয়, অপরাধী হিসেবেই দেখার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় এমন অভিযোগ শোনা যাচ্ছে যে অতীতের কিছু অপরাধী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নতুন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই তদন্তসাপেক্ষ। তবে জনগণের মধ্যে যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে অপরাধীরা আবারও রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছে, তাহলে তা গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের জন্য অশনি সংকেত।

অতীতের শিক্ষা

অতীতে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার অন্যতম আসামি নূর হোসেনকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, তা আমাদের একটি শিক্ষা দেয়—অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু অপরাধপ্রবণতা পরিবর্তন হয় না। তাই যে-ই হোক, যার সঙ্গেই সম্পর্ক থাকুক, অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণই রাষ্ট্রের একমাত্র পথ।

উত্তরণের পাঁচটি পদক্ষেপ

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি:

  1. প্রথমত, ক্ষমতাসীন দলের তৃণমূল থেকে শুরু করে সব স্তরের নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের ওপরে নজর রাখতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, দখলবাজ ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
  2. দ্বিতীয়ত, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, খুন এবং ডাকাতির মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধকে উৎসাহিত করে।
  3. তৃতীয়ত, থানা পর্যায়ে জবাবদিহি বাড়াতে হবে এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
  4. চতুর্থত, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের ভেতরে অপরাধীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হবে। কোনও দলের পরিচয় যেন অপরাধীদের নিরাপত্তার ছাতা না হয়ে ওঠে।
  5. পঞ্চমত, গোয়েন্দা নজরদারি, সিসিটিভি নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল অপরাধ বিশ্লেষণ এবং কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করতে হবে।

উপসংহার

বাংলাদেশের মানুষ শান্তি চায়, নিরাপত্তা চায়। তারা চায় না প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুলে নতুন খুন, নতুন ধর্ষণ বা নতুন ডাকাতির খবর দেখতে। কক্সবাজারের মা-মেয়ের ওপর সংঘটিত বর্বরতা, ক্রমবর্ধমান হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও ভালো হয়ে উঠতে পারেনি।

এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার। অন্যথায়, অপরাধী চক্র আরও শক্তিশালী হবে, আর তার মূল্য দিতে হবে সমগ্র জাতিকে।

লেখক: সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট, জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি