গাজীপুরে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, গণপিটুনি এবং নৃশংসতার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনার মূল কারণ হিসেবে সামাজিক অবক্ষয়, আইনের শাসনের অভাব এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে বিলম্বকে দায়ী করছেন স্থানীয় লোকজন। তারা বলছেন, কোন দিকে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। এর মধ্যে গত তিন দিনে ১০টি হত্যাকাণ্ড ঘটলেও এগুলোকে আইনশৃঙ্খলার অবনতি বলতে নারাজ পুলিশ। তবে স্থানীয় লোকজন বলছেন, একের পর এক এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকাবাসী পরিবার নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। পুলিশের এমন বক্তব্য ‘দায়িত্বহীন’।
তিন দিনে ১০ হত্যা
গত শনিবার কাপাসিয়া উপজেলার রাওতকোনা গ্রামে এক পরিবারের নারী, তার তিন মেয়ে এবং ভাইসহ পাঁচ জনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ও নিহত নারীর স্বামী ফোরকান মিয়া (৪০) পলাতক রয়েছেন। পুলিশ প্রাথমিকভাবে একে পারিবারিক কলহজনিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে সন্দেহ করছে। ওই দিন সন্ধ্যায় হত্যাকাণ্ডের শিকার নারীর বাবা শাহাদাত মোল্লা বাদী হয়ে কাপাসিয়া থানায় মামলা করেন। মামলায় তার স্বামী ফোরকান মোল্লাকে প্রধান আসামি ও আরও তিন-চার জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। তবে এখনও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
একই দিন শ্রীপুরে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে জয়নাল আবেদীন নামে এক বিএনপি নেতাকে সালিশ বৈঠকে ডেকে ইউপির সদস্যের নেতৃত্বে পিটিয়ে আহত করা হয়। সোমবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। নিহত জয়নাল আবেদীন উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ফাওগান গ্রামের মৃত নইমুদ্দীনের ছেলে। তিনি প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন।
পরদিন রবিবার ভোরে কালিয়াকৈরে গরু চুরির অভিযোগে তিন জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের বাগচালা বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- সিলেট সদর থানার ঘাসিটোলার কমলা কান্তের ছেলে কৃষাণ (৪৬), গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা বদনী ভাংনা এলাকার শরাফত আলীর ছেলে আজহারুল ইসলাম (৩৬) এবং রাজধানীর মিরপুরের মধ্য পীরেরবাগ এলাকার আবদুল বারেকের ছেলে মো. সেলিম (৩৮)। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তিরা পেশাদার গরুচোর ও ডাকাত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা আছে। তিন জনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দুটি পৃথক মামলা হয়েছে। দুই মামলায় অজ্ঞাতনামা ৫০০ জনকে আসামি করা হয়। তবে কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
একই দিন দুপুরে কাপাসিয়া উপজেলার রায়েদ ইউনিয়ন এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক মধ্যবয়সী পুরুষের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। কচুরিপানার সঙ্গে নদীতে লাশটি ভেসে থাকতে দেখে স্থানীয়রা। পরে পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করে। পুলিশের ধারণা- ওই ব্যক্তিকে কয়েক দিন আগে কে বা কারা হত্যা করে লাশটি নদীতে ফেলে দিতে পারে। পরবর্তীতে পানিতে দীর্ঘ সময় থাকায় লাশটি ফুলে ভেসে ওঠে।
সবশেষ সোমবার রাতে গাছা থানাধীন উজারপাড়া এলাকায় শুভ (১৬) নামে এক অটোরিকশাচালককে গলা কেটে হত্যা করা হয়। মঙ্গলবার ভোরে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত শুভ নেত্রকোনার মদন থানার গোবিন্দশ্রী এলাকার আমির মিয়ার ছেলে। উজারপাড়া মহরের বাড়ি এলাকা থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের কার্যকর ভূমিকা না থাকায় আইন হাতে তুলে নেয় স্থানীয়রা
এসব ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হিসেবে দেখছেন স্থানীয় লোকজন। কালিয়াকৈরের ফুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের বাগচালা গ্রামের আবুবকর সিদ্দিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে গরু চুরি, ছিনতাই ও মাদকসহ নানা অপরাধ বেড়েই চলছে। এসব ঘটনায় পুলিশ কার্যকর কোনও পদক্ষেপ না নেওয়ায় গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছিল। গ্রামবাসী গত কয়েকদিন ধরে রাতে বিভিন্ন স্থানে পাঁচ জনের একটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পাহারা দিচ্ছিলেন। এর মধ্যে ডাকাতদের পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। পুলিশ যদি কার্যকর পদক্ষেপ নিতো তাহলে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতো না।’
সলংগা এলাকার আব্দুল জব্বার বলেন, ‘কোনও ঘটনা ঘটনার পর অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনলে এসব ঘটনা ঘটতো না।’
ফুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মফিজ উদ্দিন মোল্লা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মানুষের মধ্যে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। কথায় কথায় হত্যা ও খুনোখুনিতে জড়াচ্ছে।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বলতে নারাজ পুলিশ
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কালিয়াকৈর থানার ফুলবাড়ীয়া পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জনবল কম থাকায় যথা সময়ে সব এলাকায় টহল দেওয়া সম্ভব হয় না। বর্তমানে টহল জোরদার করা হয়েছে। আগের চেয়ে চুরি ও ছিনতাই অনেকটাই কমে এসেছে।’
কাপাসিয়া থানার ওসি শাহিনুর আলম বলেন, ‘যেকোনো ঘটনা ঘটার পরই পুলিশ দ্রুত সময়ে পদক্ষেপ নেয়। এছাড়া কোথাও থেকে কোনও ধরনের অভিযোগ পেলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে পদক্ষেপ নিই। এরপরও কিছু ঘটনা ঘটে যায় আমাদের অজান্তে। আমরা আগের চেয়ে টহল জোরদার করেছি। প্রত্যেক ঘটনায় অভিযুক্তদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’
তবে এসব ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বলতে নারাজ গাজীপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মো. আশফাক উজ্জামান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কাপাসিয়া এবং কালিয়াকৈরে ঘটনা দুটি ভিন্ন। প্রেক্ষাপটও আলাদা। একটির ঘটনা ধরেন আমরা জানি এবং চিহ্নিত হয়েছে ও মোটিভ বোঝা যাচ্ছে। এটা নিয়ে আমরা কাজ করতেছি। কালিয়াকৈরের ঘটনা চুরি করতে গিয়েছিল। মানুষ তাদের এলাকায় পাহার দেয়। ওই এলাকায় পুলিশের দুটি টিমের পাশাপাশি টহল টিমও কাজ করে। তবু মানুষের ক্ষোভ থামানো যায় না। মানুষ পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। আইনগত যেটা হওয়ার কথা আমরা সেটা দেখবো। আর কাপাসিয়ার ঘটনা পারিবারিককেন্দ্রিক। ফলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কনসার্ন হওয়ার মতো অর্থাৎ একবারে সব ভেসে যাচ্ছে এরকম একদমই না। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি আমাদের নিয়মিত যে কাজগুলো মাদক মামলা, ওয়ারেন্টসহ যা কিছু আছে এসবের কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমাদের যে টহল চলমান রয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে, এটি আমরা বলছি না।’
গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কাপাসিয়ার ঘটনা পারিবারিক। অন্য ঘটনাগুলো সহিংসতা। আর এসব ঘটনায় পুলিশ পদক্ষেপ নিচ্ছে। অভিযুক্তদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’



