ঘটনার শুরু জুলাইয়ের শুরুতে। বাংলাদেশের মোটামুটি জনপ্রিয় এক অভিনেত্রী ও গায়িকা ফেসবুকে একটি পোস্ট দিলেন। সেখানে লিখলেন—‘জুলাই সিডিআই’। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হলো তুমুল আলোচনা, সমালোচনা, ট্রল আর পাল্টা ট্রল, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ। কেউ ‘জুলাই সিডিআই’ লিখে ব্যঙ্গ করছেন, কেউ এর জবাবে আরও অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করছেন। এখনও থামে নাই।
সত্যি বলতে, প্রথমে ‘সিডিআই’ শব্দের অর্থ আমি বুঝিনি। পরে ফেসবুকের পোস্ট, মন্তব্য আর মিম দেখে বুঝলাম, এটা একটা গালি!
ছেলের প্রশ্নে বিব্রত মা
দুই-একদিন পর ছেলে এসে জিজ্ঞেস করলো, ‘মা, জুলাই সিডিআই কী?’ ছেলের বয়স ১৫ বছর। জেন-জি বা জেন-আলফা। এরা যে কত রকম সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করে, তার বেশিরভাগই আমাদের মাথার ওপর দিয়ে যায়। সেও ‘জুলাই সিডিআই’ বুঝতে পারেনি। আমি ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। কী বলবো? শেষ পর্যন্ত বললাম, ‘জানি না, গুগলে দেখে নাও।’ পরে ওর বাবাকে ঘটনাটা বলতেই তিনিও একই প্রশ্ন করলেন, ‘জুলাই সিডিআই আবার কী?’
গুগল ও চ্যাটজিপিটির উত্তর
গুগলে সার্চ দিলাম। চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করলাম। আর অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, ওরাও এর সঠিক মানেটা জানে না। গুগল লিখেছে—এটি অশ্লীল (যৌন আক্রমণাত্মক শব্দ) রাজনৈতিক গালি। বাংলাদেশে অত্যন্ত অশালীন ও আপত্তিকর অর্থে ব্যবহার করা হয়। যারা ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান, এর শহীদ বা এর চেতনাকে কটাক্ষ করতে চায়—তারা এই ধরনের অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে থাকে। তবে গুগল সতর্ক করে বলেছে, শব্দটি অত্যন্ত অশালীন এবং সামাজিকভাবে বর্জনীয়।
আর চ্যাটজিপিটি সিডিআইকে ইন্টারনেট স্ল্যাং বলেছে। তবে সে এটার অর্থ করেছে করাপ্টেড ডিসগ্রেস টু ইন্টেগ্রিটি, অর্থাৎ শব্দটির দ্বারা কাউকে দুর্নীতিগ্রস্ত, নীতিহীন বা সততার সম্পূর্ণ বিপরীত হিসেবে বিদ্রূপ করা হয়।
টিনএজ সন্তানের গালি শেখা
আসলে হয়েছি কী, গত ২ বছর থেকে আমরা এই ঝামেলায় পড়েছি। ছেলের টিনএজ শুরু হয়েছে। আর দেশে গালাগালির প্রচলনও যেন বেড়ে গিয়েছে। ক’দিন আগেও ফোন টিপতে টিপতে হঠাৎ ছেলে এসে জিজ্ঞেস করলো—‘মা, শা…উ..য়া, মা..উ..য়া- কী’?
তখনও বিব্রত হয়েছিলাম। তবু বলেছিলাম, ‘এটা মেয়েদের নু..নু’। সে অবাক হয়ে বললো, ‘তাহলে এটা ছিঁড়ে ফেলতে চাচ্ছে কেন ওরা? মেয়েরা তো হিসু করতে পারবে না!’
আচ্ছা, আমরা কি সত্যিই এমন এক সমাজে পৌঁছে যাচ্ছি, যেখানে আমাদের সন্তানদের সবচেয়ে বেশি শেখানো নতুন শব্দগুলো হচ্ছে গালি? গালি কি সত্যিই বেড়েছে? নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে আমরা এখন আগের চেয়ে বেশি দেখতে পাচ্ছি?
গালির পরিসংখ্যান ও ফেসবুকের ভাষা
এর সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান হয়তো নেই। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—ফেসবুকের রাজনৈতিক ভাষা আগের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র, ব্যক্তিগত আর আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। মতের বিরোধ হলেই এখন প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে অপমানজনক ভাষার ব্যবহার বেড়েছে। যুক্তির বদলে ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ আর অশ্লীল শব্দ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
এর একটি কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাঠামোও হতে পারে। রাগ, ক্ষোভ, বিস্ময় বা অপমান—এসব আবেগ মানুষকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে এমন পোস্ট বেশি মন্তব্য, শেয়ার ও প্রতিক্রিয়া পায়। অ্যালগরিদমও সেই কনটেন্ট আরও মানুষের সামনে নিয়ে আসে। এ কারণেই গালাগালি-মিশ্রিত পোস্ট অনেক সময় যুক্তিনির্ভর লেখার চেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়ে।
গালি দেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক কারণ
তবে সবাই যে কেবল ভাইরাল হওয়ার জন্য গালি দেয়, এমন নয়। কেউ কেউ দলীয় আনুগত্য দেখাতে, কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করতে, কেউ ভিড়ের সঙ্গে তাল মেলাতে, আবার কেউ সত্যিই মনোযোগ পেতে এমন ভাষা ব্যবহার করে।
মনোবিজ্ঞান বলে, অনেক সময় মানুষ যখন প্রবল রাগ, অপমানবোধ বা দলগত উন্মাদনার মধ্যে থাকে, তখন সে প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে নয়, প্রতীক হিসেবে দেখতে শুরু করে। তখন যুক্তির জায়গা দখল করে অবমাননা। ব্যক্তির বদলে তার পরিচয়, পরিবার বা শরীর আক্রমণের লক্ষ্য হয়। আর এখানেই জড়িয়ে আছে আমাদের সমাজ-মানসের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি।
একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, পুরো বিশ্বেই, বিশেষ করে আমাদের উপমহাদেশে, মেয়েদের যৌনাঙ্গ নিয়ে গালি দিতে মানুষ বেশি পছন্দ করে। মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, এটি মূলত চরম হীনম্মন্যতা ও অবদমিত পুরুষতান্ত্রিক আগ্রাসনের বহিঃপ্রকাশ। যখন মানুষ যুক্তিতে হেরে যায়, ভিন্নমতের বিশেষ করে কোনও নারীকে শ্রদ্ধা করতে পারে না, কিংবা তাকে ছোট করার অন্য কোনও পথ পায় না—তখনই সে অবচেতনভাবে এই যৌন আক্রমণাত্মক গালিগুলোকে অস্ত্র হিসেবে বেছে নেয়। প্রতিপক্ষের যোগ্যতার সমান বা কাছাকাছি যাওয়ার ক্ষমতা যখন থাকে না, তখন তাকে সামাজিকভাবে ‘ডিহিউম্যানাইজ’ বা অমানুষ হিসেবে প্রমাণ করার সস্তা ও বিকৃত আনন্দ দেয় এই গালিগালাজ।
অনলাইনে সংযম হারানো
অনলাইনে মানুষের এই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় মনস্তাত্ত্বিক কারণ হলো—‘অনলাইনে আত্মসংযম হারিয়ে ফেলা বা অনলাইনে সংযম কমে যাওয়ার প্রবণতা’। অর্থাৎ, স্ক্রিনের ওপারে বসে যখন কেউ নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে বা সামনাসামনি জবাবদিহির ভয় ছাড়া মন্তব্য করে, তখন তার ভেতরের আদিম ও উগ্র রূপটি অনায়াসে বেরিয়ে আসে। বাস্তবে যে কথাটি মুখে আনার সাহস কেউ পাবে না, লাইক আর কমেন্টের ‘ভার্চুয়াল ভ্যালিডেশন’ বা ডোপামিন আসক্তির লোভে ফেসবুকে তা-ই সে বুক ফুলিয়ে লিখে দেয়।
মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরা তার নৈতিক বিচ্ছিন্নতা ধারণায় দেখিয়েছেন, মানুষ যখন মনে করে যে প্রতিপক্ষ খারাপ, দেশদ্রোহী, অমানুষ বা শত্রু, তখন তার প্রতি স্বাভাবিক নৈতিক দায়বদ্ধতা কমে যায়। তখন গালি দেওয়া, অপমান করা, এমনকি সহিংস ভাষা ব্যবহার করাকেও নিজের কাছে ন্যায্য মনে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক মেরুকরণের সময় এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দলগত মেরুকরণ ও শিশুদের ওপর প্রভাব
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সাধারণত আমাদের মতো মানুষদের সঙ্গেই বেশি যুক্ত থাকি। ফলে একই ধরনের মতামত বারবার শুনতে শুনতে অবস্থান আরও কঠোর হয়ে যায়। মনোবিজ্ঞানে একে ‘দলগত মেরুকরণ বা গ্রুপ পোলারাইজেশন’ বলা হয়। তখন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যত কঠোর ভাষা ব্যবহার করা যায়, নিজের দল থেকে তত বেশি সমর্থন পাওয়া যায়।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই ভাষা এখন কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিশু, কিশোর-কিশোরীরাও এগুলো শুনছে, দেখছে, শিখছে। শব্দের অর্থ না জানলেও তারা বুঝে যাচ্ছে এগুলো দিয়ে কাউকে ছোট করা যায়।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়
প্রশ্ন হলো, আমাদের এই সন্তানরা কী শিখবে? আমরা কি তবে মেধা, যুক্তি আর শালীনতার এক চূড়ান্ত দেউলিয়াত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? আমার ভয় জুলাই সিডিআই শব্দটিকে নিয়ে নয়। কয়েক মাস পর হয়তো এই শব্দটি হারিয়ে যাবে। তার জায়গায় আসবে আরেকটি নতুন গালি, নতুন মিম, নতুন ট্রল। আমার ভয় অন্য জায়গায়। আমার ছেলে আগামী বছর আবার যখন আসবে, ততদিনে কি এসে যাবে নতুন কোনও গালি? সে যখন ওই নতুন গালির অর্থ জানতে চাইবে, তখন আমি তাকে কী শেখাবো— ভিন্নমতকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করতে হয়, নাকি গালি দিয়ে?
লেখক: সাইকোলজিস্ট



