ভারতে ফেরত যেতে চার ভারতীয় নাগরিকের আকুতি, বিএসএফের অসহযোগিতা
ভারতে ফেরত যেতে চার ভারতীয় নাগরিকের আকুতি

পুশইনের শিকার হয়ে প্রায় এক বছর বাংলাদেশে আটকে আছে শিশুসহ চার ভারতীয় নাগরিক। গত বছরের জুন মাসে ভারতীয় ৬ মুসলিম নাগরিককে কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে পুশইন করে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। পরবর্তীতে পুলিশের হাতে আটকের খবর গণমাধ্যমে প্রচার হলে শিশুসহ দুইজনকে ফেরত নেয় ভারত। বাকি চারজনকে পরে ফেরত নেওয়ার আশ্বাস দিলেও তাদের ফেরত নেয়নি বিএসএফ। ভারতের অসহযোগিতার কারণে অসহায় এই ৪ ভারতীয় নাগরিক এখন অনেকটা মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। তারা বলেন, 'আমরা ভারতের নাগরিক, দয়া করে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।'

আদালতের নির্দেশেও ফেরত নিচ্ছে না বিএসএফ

এই চার ভারতীয়কে নিজ দেশে ফেরত নিতে এরই মধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। তারপরও ফেরত যেতে না পারায় চরম হতাশায় দিন কাটছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার মুরারাই থানার ধীতর গ্রামের দানেশ শেখ, সুইটি বিবি, সুইটি বিবির দুই সন্তান কুরবান ও ইমাম হোসেনের।

দানেশ শেখ জানান, আমি ইন্ডিয়ান নাগরিক। গত বছর আমাদের ৬ জনকে দিল্লিতে থেকে জোর করে এনে কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে পুশইন করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। এরপর বাংলাদেশের পুলিশ আমাদের ধরে জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়। তিন মাস পর জামিনে বের হই, তারপর আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সোনালী খাতুন ও আমার ছেলে সাব্বিরকে ভারতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে বিএসএফ। আমাদেরও দেশে ফেরত নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু আমার স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে গেলেও আমিসহ বাকি ৪ জনকে নিয়ে যাচ্ছে না। নিজ জন্মভূমি ভারতে ফেরত যেতে চান বলে জানান দানেশ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অপর ভারতীয় নাগরিক সুইটি বিবি বলেন, আমাদের বাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার মুরারাই থানার ধীতর গ্রামে। দিল্লিতে আমরা সাফাইয়ের কাজ করে পরিবার নিয়ে বসবাস করতাম। দিল্লি পুলিশ আমাদের বাংলাদেশি বলে ধরে এনে প্রথমে আসামে নিয়ে যায়। তারপর রাতের অন্ধকারে বর্ডারে এনে কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়ে দেয়। পরে আমরা ফিরে গেলে বিএসএফ আমাদের মারধর করে আবার বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। সেই সময় তারা আমাদের ভয় দেখায়, যদি ভারতে ফিরে আসি তাহলে আমাদের গুলি করে মেরে ফেলবে।

তিনি আরও বলেন, কিছুদিন কুড়িগ্রাম ও ঢাকায় থাকার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জে এলে আমাদের পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়ে জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়। ৩ মাস ১০ দিন পর জেলখানা থেকে জামিনে বের করে ফারুক দাদার বাড়িতে নিয়ে যায়। গত বছরের ৫ ডিসেম্বর অন্তঃসত্ত্বা সোনালী খাতুন ও তার ছেলেকে সোনামসজিদ দিয়ে ভারতে নিয়ে যায় বিএসএফ। আমাদেরও নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু আমাদের শেষপর্যন্ত নেয়নি। পরে নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও গত এবছর থেকে আমার দুই সন্তানকে নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফারুক দাদার বাড়িতে আছি।

এ সময় তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ভারতে আমাদের বাবা-মা আত্মীয়-স্বজন সবাই আছে। আমরা ভারতের নাগরিক, দয়া করে আপনারা আমাদের দেশ ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

মানবিক আশ্রয়দাতার দুঃখ

আদালতের নির্দেশে মানবিক কারণে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দেওয়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের কল্যাণপুর গ্রামের ফারুক হোসেন বলেন, আমার দাদার বাড়ি ভারতে। সেই সূত্রে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের রাজ্যসভার সদস্য সামিউল হকের প্রতিনিধি মফিজুল শেখ বাংলাদেশে এসে জানান- ভারতের আদালত অন্তঃসত্ত্বা সোনালী খাতুন ও তার শিশু সন্তান সাব্বিরকে ১০ দিনের মধ্যে ভারতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সেই দেশের সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। পরে বাংলাদেশের আদালত এই ছয় ভারতীয় নাগরিককে জামিন দিয়ে আমার জিম্মায় দেয়। আমিও মানবিক কারণে এবং আদালতের নির্দেশে তাদের আশ্রয় দিই।

তিনি আরও বলেন, গত ৫ ডিসেম্বর সোনালী ও তার ছেলেকে বিএসএফ সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে ফেরত নিয়ে যায়। বাকি ৪ জনকে সেদিন সোনামসজিদে নিয়ে গিয়েছিলাম। কারণ এই ৪ জনকেও ফেরত নেওয়ার কথা ছিল; কিন্তু সোনালী খাতুন ও ছেলে এই দুইজনকে ফেরত নিয়ে গেলেও এদেরকে নিতে অস্বীকার করে। এমনকি সোনালীর স্বামী দানেশকেও নেয়নি বিএসএফ। তখন থেকে তারা আমার জিম্মায় আছে। আমি গরিব মানুষ, দীর্ঘ প্রায় এক বছর থেকে আমি তাদের ভরণ-পোষণ করছি কিন্তু বর্তমানে আমি অসহায়। এখন তাদের খরচ চালানোর সামর্থ্য আমার এখন নাই।

ফারুক উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীদের অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আপনারা দয়া করে এদের নিজ দেশ ভারতে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

জেলা প্রশাসকের বক্তব্য

চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা বলেন, সোনালী খাতুন ও তার ছেলে মোহাম্মদ সাব্বির শেখকে ফেরত নিলেও বাকি ৪ ভারতীয় নাগরিককে ফেরত এখনো ফেরত নেয়নি। কোন পয়েন্ট অব ভিউ থেকে তাদের ফেরত নেয়নি সেটা সে দেশের সরকার ভালো বলতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সবসময় চেষ্টা ছিল এসব ভারতীয় নাগরিককে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে। তাদের ফেরত নিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের কোর্ট থেকে সমাধান করা হয়েছিল। এছাড়া ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেলেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। সেই কারণে দুইজন ভারতীয় নাগরিককে ফেরত নেওয়া হলেও বাকিদের কেন ভারত ফেরত নেয়নি সেটি একটি প্রশ্ন। ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে রাখার কোনো কারণ নাই। সুতরাং এ বিষয়ে ভারত সরকার ভালো বলতে পারবে বলে জানান তিনি।