গাজীপুরে মাদ্রাসাশিক্ষার্থী অপহরণ নাকি প্রেমের সম্পর্ক? পুলিশের উদ্ধার ও গ্রেফতার
গাজীপুরের শ্রীপুরে ১৬ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাশিক্ষার্থীকে অপহরণের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনাটি ১৪ এপ্রিল ঘটলেও চার দিন পর শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে পুলিশ শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে। তবে অভিযুক্ত যুবকের পরিবারের দাবি, এটি অপহরণ নয়, বরং প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে ওই ছাত্রী স্বেচ্ছায় তাদের ছেলের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেছে।
ঘটনার বিবরণ ও পুলিশের অভিযান
শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে পুলিশ শ্রীপুরের গাজীপুর ইউনিয়নের নয়নপুর এলাকা থেকে ওই শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে। এ সময় মামলার প্রধান আসামি আবিদসহ অন্যরা পালিয়ে যান। উদ্ধারের পর ছাত্রীর মেডিক্যাল পরীক্ষা এবং জবানবন্দি গ্রহণের জন্য আদালতে পাঠানো হয়। পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন- শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া পশ্চিম খণ্ড এলাকার সবদের আলীর ছেলে সজল আহমেদ (২৬), মেয়ে রাজিয়া বেগম (৪৫), সুরুজ মিয়ার স্ত্রী আবেদা বেগম (৪৫), আশ্রব আলীর ছেলে খলিল (৫০), বরমীর কায়েতপাড়া গ্রামের জাফর আলীর ছেলে মফিজুর রহমান (৫৩), মফিজুর রহমানের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম ও একই এলাকার শামীম (৩৫)। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার পটভূমি ও বিতর্ক
১৪ এপ্রিল সকালে ছাত্রীকে অপহরণ করা হয়েছিল অভিযোগে ১৫ এপ্রিল তার বাবা ১০ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ৩০ জনকে আসামি করে শ্রীপুর থানায় মামলা করেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আবিদ নামে এক যুবক দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করে আসছিলেন এবং অপহরণের হুমকি দিতেন। ১৪ এপ্রিল মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে আবিদ ও তার সহযোগীরা তাকে অপহরণ করেন। একই দিন তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে আনা হয়, কিন্তু সালিশ বৈঠকের সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আবিদ ও তার সহযোগীরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে বাড়িতে হামলা চালিয়ে ছাত্রীকে পুনরায় তুলে নিয়ে যান।
ছাত্রীর বাবা বলেন, 'মেয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরেছিল। সেখান থেকে আমার গলায় অস্ত্র ঠেকিয়ে মেয়েকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। কোর্ট ম্যারেজ এবং প্রেমের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুয়া ও মিথ্যা। আসামিদের দোষত্রুটি ঢাকতে সমস্ত অপবাদ আমার মেয়ের ওপর দেওয়া হচ্ছে।'
অভিযুক্তের পরিবারের বক্তব্য
আবিদের ফুফাতো বোন স্বর্ণা আক্তার দাবি করেন, 'আবিদ আর ওই শিক্ষার্থী প্রতিবেশী। পাশাপাশি বাড়ি হওয়ায় আবিদের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের দিন ছেলে-মেয়ে দুজনে পালিয়ে গিয়ে কোর্ট ম্যারেজ করেছিল। পরদিন সকালে স্ত্রীকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসে আবিদ। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের সিদ্ধান্ত হলে মেয়েকে তার বাবা-মায়ের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এরপর মেয়েকে ঘরে নিয়ে তার বাবা মারধর করেন। মেয়ে চিৎকার দিয়ে ছেলের পরিবারের সহযোগিতা চাইলে আবিদের স্বজনরা ক্ষুব্ধ হন এবং ঘরের তালা ভেঙে মেয়েকে নিয়ে যান। এখানে অপহরণের মতো কোনও ঘটনা ঘটেনি।'
পুলিশ ও আদালতের অবস্থান
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শ্রীপুর থানার উপপরিদর্শক লাল চান বলেন, 'শনিবার ওই ছাত্রীকে আদালতে তোলা হলে গাজীপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক আসমা জাহান তাকে বাবার জিম্মায় দেন।' শ্রীপুর থানার পরিদর্শক সঞ্জয় সাহা বলেন, 'ছাত্রীর মেডিক্যাল পরীক্ষা, বয়স নির্ধারণ এবং জবানবন্দি গ্রহণের জন্য আদালতে পাঠানো হয়েছিল। তবে আদালত জবানবন্দি গ্রহণ করেননি ওই দিন। মেয়েকে বাবার জিম্মায় দেন। এটি আদালত ও তার পরিবারের বিষয়।'
একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই ছাত্রীর সঙ্গে আবিদের প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। সেই সূত্র ধরে ঘটনাটি ঘটেছে। পরে এ ঘটনায় অপহরণের মামলা করেছিল মেয়ের পরিবার।
সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব
ঘটনাটি নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিলে বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এটি ঘটনার তদন্ত ও জনমত গঠনে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।



