আফগানিস্তানে তালেবান আদালতে নারীর বিচ্ছেদ আবেদন বাতিল, বিচারকের উপহাস
আফগানিস্তানে তালেবান আদালতে নারীর বিচ্ছেদ আবেদন বাতিল

আফগানিস্তানে তালেবান শাসনে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র

আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে নারীদের বিরুদ্ধে একের পর এক কঠোর আইন কার্যকর হচ্ছে। দেশটিতে নারীদের ঘরবন্দি অবস্থার পাশাপাশি পুরুষদের দ্বারা নির্যাতনের মাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা উন্মোচিত হয়েছে।

ফারজানার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা

উত্তর আফগানিস্তানের এক নারী ফারজানা (ছদ্মনাম) তার স্বামীর হাতে কেবল দিয়ে মারধরের শিকার হয়ে আদালতে বিচ্ছেদের আবেদন করেন। তবে বিচারক তার আবেদন শুনে তাকে উপহাস করে বলেছেন, "তুমি শুধু এই কারণেই বিচ্ছেদ চাও? সামান্য রাগ আর কয়েকটা মার খেলে তো আর মরে যাবে না।"

ফারজানা জানান, তার স্বামী অত্যন্ত বদমেজাজি এবং সামান্য কারণেই তাকে মারধর করেন। ফারজানার ডান পা বাঁ পায়ের তুলনায় কিছুটা ছোট হওয়ায় স্বামী তাকে নিয়মিত ‘প্রতিবন্ধী’ বলে অপমান ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি দীর্ঘদিন এই নির্যাতন সহ্য করে আসছিলেন।

সহিংসতার চূড়ান্ত পর্যায়

ফারজানা বলেন, "একদিন আমি অনেক অসুস্থ ছিলাম এবং সেদিন রাতের খাবার রান্না করার মতো কোনো শক্তি ছিল না। স্বামী কাজ থেকে ফিরলে আমাকে বলে, এখন তুমি ঘরের কাজটুকুও করো না। আমি তাকে অসুস্থতার কথা জানালে সে মোবাইল চার্জারের কেবল দিয়ে আমাকে বেদম পেটায়। আমার পিঠে ও হাতে সেই মারের চিহ্ন কয়েক দিন পর্যন্ত ছিল।"

এই নির্যাতনের পর ফারজানা সিদ্ধান্ত নেন তিনি আদালতে বিচ্ছেদের আবেদন করবেন। কিন্তু তার মামলা তালেবানের আদালত পর্যন্ত পৌঁছালে আদালত তার আবেদন শুধু বাতিলই করেনি, বরং ফারজানাকে নিয়ে উপহাস করেছে।

আদালতের অমানবিক প্রতিক্রিয়া

ফারজানা বলেন, "যখন আমি বলি স্বামী আমাকে মারধর করে, নিয়মিত উপহাস, অপমান করে এবং তাই আমি বিচ্ছেদ চাই- তখন বিচারক পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘তুমি শুধু এই কারণেই ডিভোর্স চাও? আর অন্য কোনো কারণ নেই?’"

ফারজানা যখন তার ওপর হওয়া সাম্প্রতিক নির্যাতনের বর্ণনা দেন, তখন বিচারক প্রমাণ দেখতে চান। কিন্তু ফারজানা কোনো প্রমাণ দেখাতে না পারায় বিচারক তাকে ভর্ৎসনা করে বলেন, "তুমি যখন তরুণী ছিলে তখন স্বামীর সঙ্গে দিনগুলো উপভোগ করেছ। এখন সে বৃদ্ধ হচ্ছে দেখে তুমি বিচ্ছেদের অজুহাত খুঁজছ যাতে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারো। ফিরে যাও, তোমার স্বামী অনেক ভালো, তার সঙ্গেই থাকো।"

তালেবানের আইনি বৈষম্য

বিচারক আরও যোগ করেন, "ইসলামে স্বামীকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে যেন অবাধ্য স্ত্রীকে শাসনের জন্য মারধর করা হয়। যাও, আর কখনো এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিচ্ছেদ চাইতে আসবে না।"

আফগানিস্তান-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা রওয়াদারির প্রধান শাহরজাদ আকবর বলেন, "বর্তমানে আফগানিস্তানে এমন ঘটনা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীদের পারিবারিক সহিংসতার মধ্যেই বেঁচে থাকতে হয়, নতুবা তালেবান আদালতের কাছে বিচার চাইতে হয়—যেখানে আবার তাদের উল্টো উপদেশ দেওয়া হয় এবং পুনরায় সেই সহিংস বাড়িতেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়।"

মানবাধিকার সংস্থার সতর্কবার্তা

বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ এবং আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে আফগান নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের নিষেধাজ্ঞা আসলে ‘লিঙ্গবৈষম্য’ বা ‘জেন্ডার অ্যাপার্থাইড’। গত বছর তালেবানের নতুন দণ্ডবিধিতে নারীদের ওপর সহিংসতাকে আরও উসকে দেওয়া হয়েছে।

দেশটিতে নতুন এই বিধি অনুযায়ী, পুরুষেরা তাদের স্ত্রীদের মারধর করতে পারবেন যতক্ষণ না হাড় ভাঙা বা গভীর জখম হয়। এই আইন নারী নির্যাতনকে বৈধতা দিচ্ছে এবং নারীদের অধিকার হরণ করছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করছে।