নিউ মেক্সিকোতে এপস্টিনের জোরো র্যাঞ্চ তদন্ত শুরু, রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতারা গতকাল সোমবার একটি ঐতিহাসিক আইন পাস করেছেন, যা কুখ্যাত মার্কিন যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিনের জোরো র্যাঞ্চ নামের খামারে ঘটে যাওয়া যৌন নির্যাতন ও নারী পাচারের ঘটনার প্রথম পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করার উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই আইনের আওতায় গঠিত একটি তদন্ত কমিটি খামারটিতে ভ্রমণকারী অতিথি, সরকারি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সাক্ষ্য নেবে, যাতে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা যায়।
তদন্তের বিস্তারিত ও লক্ষ্য
নিউ মেক্সিকোর প্রতিনিধি পরিষদে সর্বসম্মতভাবে পাস হওয়া এই আইনে ২৫ লাখ ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত কমিটিকে সমন জারি করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। কমিটির মূল লক্ষ্য হলো, নিউ মেক্সিকোর আইনে বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা, যা এপস্টিনকে সেখানে সহজে অপকর্ম চালাতে সহায়তা করেছিল। কমিটির আগামী জুলাই মাসে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন এবং বছরের শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
এই তদন্তে চারজন আইনপ্রণেতা রয়েছেন, যারা তথাকথিত ‘সত্য অনুসন্ধান কমিশন’ হিসেবে কাজ করবেন। তারা এপস্টিনের ৭ হাজার ৬০০ একর আয়তনের খামারটিতে যারা ভ্রমণ করেছেন, তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন। আশা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে খামারের মূল ভবন ও অতিথি ভবনে সংঘটিত যৌন নির্যাতনে কারা অংশ নিয়েছিলেন, তা উদ্ঘাটিত হবে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও সংশ্লিষ্টতা
ডেমোক্রেটিক নেতৃত্বাধীন এই তদন্ত রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে এবং এপস্টিনের অপরাধ উদ্ঘাটনের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ এপস্টিন সংক্রান্ত লাখ লাখ নথি প্রকাশ করেছে, যেখানে জোরো খামারে ঘটা নানা কর্মকাণ্ডের তথ্য রয়েছে। নথিগুলোতে দেখা গেছে, এপস্টিনের সঙ্গে নিউ মেক্সিকোর দুজন সাবেক ডেমোক্র্যাট গভর্নর এবং একজন অ্যাটর্নি জেনারেলের সম্পর্ক ছিল।
বছরের পর বছর ধরে এপস্টিন নিউ মেক্সিকোর ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক প্রচারেও আর্থিক ভূমিকা রেখেছিলেন, যেমন বিল রিচার্ডসন এবং অ্যাটর্নি জেনারেল গ্যারি কিং। সংবাদমাধ্যমে এ–সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হওয়ার পর দুজনই প্রতিশ্রুতি দেন, তাঁরা টাকা ফিরিয়ে দেবেন বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করবেন। ই–মেইল অনুযায়ী, ২০১৪ সালে গ্যারি কিং নিউ মেক্সিকোর গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় এপস্টিনের চার্টার্ড বিমান ব্যবহার করেছিলেন, যার ভাড়া ভাগাভাগি করা হয়েছিল।
খামারের ইতিহাস ও অভিযোগ
এপস্টিন ১৯৯৩ সালে ব্রুস কিংয়ের কাছ থেকে জোরো র্যাঞ্চ নামের এই খামারটি কিনেছিলেন, যা স্থানীয়ভাবে ‘প্লেবয় র্যাঞ্চ‘ নামে পরিচিত। ব্রুস কিং তিন দফায় নিউ মেক্সিকোর গভর্নর ছিলেন এবং ২০০৯ সালে মারা যান। সান্তা ফে নিউ মেক্সিকানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপস্টিনের প্রতিষ্ঠান ২০২৩ সালে এই খামারকে ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ ডন হাফিনেসের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে, যিনি যেকোনো তদন্তে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছেন বলে জানিয়েছেন।
খামারটির ব্যবস্থাপক ব্রাইস গর্ডন ২০০৭ সালে এফবিআইকে বলেছিলেন, এপস্টিন অতিথি এবং ম্যাসাজ থেরাপিস্টদের ওই খামারে নিয়ে আসতেন, যাদের বেশির ভাগকেই সান্তা ফের স্থানীয় স্পা প্রতিষ্ঠান টেন থাউজ্যান্ড ওয়েভস থেকে বা পরিচিতদের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে ওই স্পা প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র দাবি করেছেন, তারা কাউকে সেখানে পাঠাননি।
অভিযোগ আছে, ১৯৯৬ সালের শুরুর দিকে এপস্টিন ওই খামারে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীর ওপর যৌন নিপীড়ন চালিয়েছিলেন। ভার্জিনিয়া জিউফ্রে নামের এক নারী আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন যে, এপস্টিনের সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েল তাঁকে জোরো র্যাঞ্চে নিউ মেক্সিকোর সাবেক গভর্নর বিল রিচার্ডসনকে ‘ম্যাসাজ‘ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যদিও রিচার্ডসনের প্রতিনিধি এই অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা‘ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ
ভুক্তভোগীদের পক্ষে কাজ করা অধিকারকর্মীরা এই তদন্ত পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, পূর্ববর্তী ফেডারেল তদন্তে মূলত এপস্টিনের ক্যারিবীয় দ্বীপ ও নিউইয়র্কের বাড়ির দিকে নজর দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু জোরো র্যাঞ্চ প্রায় উপেক্ষিত ছিল। আইনপ্রণেতা আন্দ্রিয়া রোমেরো বলেন, খামারটিতে যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোনো কেন্দ্রীয় সংস্থা আগে কখনো তল্লাশি চালিয়েছে বলে তথ্য নেই, যা এই তদন্তকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
এপস্টিন ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে মারা যান, যা কর্তৃপক্ষ আত্মহত্যা হিসেবে সাব্যস্ত করে। ওই সময় তাঁর বিরুদ্ধে নারী পাচারসংক্রান্ত একটি মামলায় বিচারকাজ চলছিল। এই নতুন তদন্তের মাধ্যমে আশা করা হচ্ছে, নিউ মেক্সিকোর আইনি ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা প্রতিরোধে সহায়ক হবে।
