স্মৃতির ঘাতক ও বিস্মৃতির রাজনীতি: একটি বিশ্লেষণ
স্মৃতির ঘাতক ও বিস্মৃতির রাজনীতি: বিশ্লেষণ

ক্ষমতা যখন স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠে, তখন সে কেবল মানুষের শরীর বা সম্পদ দখল করে না, সে দখল করে মানুষের স্মৃতি। স্মৃতি যদি মুদ্রার এপিঠ হয় তবে বিস্মৃতি মুদ্রার ওপিঠ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মাত্র জানেন, বিস্মৃতি কোনও প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। বিস্মৃতি যখন ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা হয়, তখন এটি কেবল সময়ের নিয়মে কোনও কিছু ভুলে যাওয়া নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত এবং কাঠামোগত প্রক্রিয়া। ক্ষমতা যখন নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে চায়, তখন সে তার প্রতিকূল ইতিহাস, সংস্কৃতি বা স্মৃতিকে মুছে ফেলতে সচেষ্ট হয়। এই রাজনৈতিক প্রকল্পের জন্য রাষ্ট্রপ্রধান কয়েকটি প্রকল্প হাতে নেয় এবং অনেক সময় সচেতনভাবে এবং অবচেতনভাবে বিস্মৃতির বিপক্ষে থাকা নাগরিক ও রাজনৈতিক দলের কর্মীরা রাষ্ট্রের প্রকল্পের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে এবং যে বা যারা বিশেষ করে সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এবং সমাজে অধিকার সচেতন ব্যক্তিবর্গকে আক্রমণ করে বসে। একবার, দুইবার কিংবা তিনবার সমাজের সচেতন অংশের বিরোধিতার ফলে এই ধরনের আক্রমণগুলো থেমে যায়। তবে যেহেতু বিচারহীনতার বাস্তবতা নিরঙ্কুশ—মানে অবাধ, নিয়ন্ত্রণহীন, একচ্ছত্র, চরম বা বাধাহীন, তাই এই আক্রমণ চলমান প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মৃতির ঘাতক ও বিস্মৃতির রাজনীতি

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান—এই দুটি মাইলফলক ঘিরে স্মৃতির ঘাতক ও বিস্মৃতির রাজনীতির যে রূপান্তর ঘটেছে এবং গভীরভাবে ঘটছে, তা আমাদের সমাজে গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। স্মৃতির ঘাতক ও বিস্মৃতির রাজনীতি শুধুমাত্র ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে হয়েছে তা নয়। বিস্মৃতির রাজনীতি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা কেবলমাত্র বড় কোনও পটপরিবর্তন (যেমন- ১৯৭১ বা ২০২৪) নয়, বরং প্রতিটি ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জনআন্দোলন এবং প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাসের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠী

বাংলাদেশে এই ‘স্মৃতিহত্যার’ রাজনীতি আরও অনেকগুলো বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। যেমন- পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় এবং তাদের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসকে মূলধারার জাতীয় স্মৃতি থেকে সুকৌশলে সরিয়ে রাখা হয়েছে। নিদর্শন হিসেবে ১৯৭২ সালের সংবিধানে তাদের ‘বাঙালি’ পরিচয়ে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা ছিল প্রথম বড় ‘বিস্মৃতি’। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার লড়াই বা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভূমি অধিকারের ইতিহাসকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে সাধারণ জনগণের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলার একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রকল্প চালু আছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তেভাগা ও নানিডাঙ্গা কৃষক আন্দোলন

বিস্মৃতির রাজনীতি হয়েছে তেভাগা ও নানিডাঙ্গা কৃষক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে, বাংলার কৃষক সংগ্রামের অত্যন্ত শক্তিশালী ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও, আধুনিক নগরকেন্দ্রিক রাজনীতির ডামাডোলে এগুলো বিস্মৃতপ্রায়। ইলা মিত্রের সংগ্রাম বা নাচোলের কৃষক বিদ্রোহের মতো ঘটনাগুলো পাঠ্যপুস্তকে বা রাষ্ট্রীয় আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত। গ্রামীণ প্রান্তিক মানুষের এই লড়াইগুলোকে ‘শ্রেণি সংগ্রামের’ ট্যাগ দিয়ে মূলধারার জাতীয়তাবাদী বয়ান থেকে আলাদা রাখা হয়েছে।

রক্ষীবাহিনী ও ৭২-৭৫-এর রাজনৈতিক নিপীড়ন

রক্ষীবাহিনী ও ৭২-৭৫-এর রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের একটি বিশাল অংশের ইতিহাস কেবল দলীয় বয়ানে সীমাবদ্ধ। জাসদ ও অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর দমন-পীড়ন এবং রক্ষীবাহিনীর বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে কোনও নির্মোহ আলোচনা রাষ্ট্রীয় মহাফেজখানায় স্থান পায় না। এক পক্ষ একে পুরোপুরি অস্বীকার করে, অন্য পক্ষ একে অতিরঞ্জিত করে—মাঝখান থেকে বস্তুনিষ্ঠ স্মৃতিটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।

গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড

বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তাকে মুছে ফেলার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ‘বিস্মৃতি প্রকল্প’ কাজ করেছে; আয়নাঘরের মতো গোপন বন্দিশালার অস্তিত্ব অস্বীকার করা, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কণ্ঠস্বর সেন্সরশিপের মাধ্যমে চেপে ধরা এবং রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে একে ‘অপরাধ দমন’ হিসেবে বৈধতা দেওয়া—এটি সমসাময়িক ইতিহাসের ওপর চালানো একটি ভয়ংকর বিস্মৃতির রাজনীতি।

ধর্মীয় সহিংসতা

ভারতে ১৯৯২-এর বাবরি মসজিদ ধ্বংস পরবর্তী দাঙ্গা, ২০০১-এর নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বা পরবর্তী সময়ে রামু ও নাসিরনগরের মতো ঘটনাগুলো জনস্মৃতি থেকে খুব দ্রুত মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। এই ঘটনাগুলোর বিচার না হওয়া এবং তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করার মাধ্যমে এগুলোকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়, যাতে বৃহত্তর সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি না হয়।

পোশাক শ্রমিক আন্দোলন

পোশাক শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লড়াই বা রানা প্লাজা বা তাজরীন ফ্যাশনসের মতো কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের স্মৃতিকেও বিস্মৃতির চাদরে ঢাকা হয়। প্রতি বছর দিবসভিত্তিক শোক পালন করা হলেও এই শ্রমিকদের জীবনের মূল্য এবং তাদের শোষণের মূল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো নিয়ে আলোচনা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। একে কেবল একটি ‘দুর্ঘটনা’ বা ট্র্যাজেডি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলে।

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অনন্য মাইলফলক, যা দীর্ঘ ৯ বছরের সামরিক স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অভ্যুত্থানের চেতনা এবং স্মৃতিকে মুছে ফেলার বা বিকৃত করার একটি সচেষ্ট প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। নব্বইয়ের আন্দোলনের প্রাণভোমরা ছিলেন নূর হোসেন, ডা. মিলন, সেলিম, দেলোয়ার প্রমুখ। বিস্মৃতির রাজনীতির অন্যতম নিদর্শন হলো—রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠান বা জাতীয় পঞ্জিকায় এই নামগুলো কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখা। বিশেষ করে নূর হোসেনের যে শরীরি প্রতিবাদ (বুকে-পিঠে লেখা স্লোগান), তাকে একটি নিছক ‘আইকনিক ছবি’তে রূপান্তর করা হয়েছে, কিন্তু তার সেই আমূল গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

স্বৈরাচারী শক্তির রাজনৈতিক বৈধতা

বিস্মৃতির রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো স্বৈরাচারী শক্তির রাজনৈতিক বৈধতা। নব্বইয়ের অভ্যুত্থানের মূল দাবি ছিল স্বৈরতন্ত্রের বিনাশ। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার সমীকরণে সেই স্বৈরাচারী শক্তিকেই সঙ্গী করে নেয়। এটি জনগণের সেই ত্যাগের স্মৃতিকে অবজ্ঞা করার একটি চরম উদাহরণ, যা তরুণ প্রজন্মকে এই বার্তা দেয় যে— আন্দোলন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সুবিধাবাদ দীর্ঘস্থায়ী।

তিন জোটের রূপরেখা

নব্বইয়ের অভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও বামপন্থি দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ‘তিন জোটের রূপরেখা’ ছিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সামাজিক চুক্তি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গণতান্ত্রিকীকরণ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের যে অঙ্গীকার সেখানে ছিল, তা পরবর্তী দশকগুলোতে ক্রমাগত লঙ্ঘিত হয়েছে। এই রূপরেখাকে আড়ালে চলে যেতে দেওয়া বিস্মৃতির রাজনীতির একটি কাঠামোগত অংশ।

শিক্ষাব্যবস্থায় উপেক্ষা

শিক্ষাব্যবস্থায় এবং পাঠ্যপুস্তকে ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হয়। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন বা ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে মহিমান্বিত করা হয় (যা অবশ্যই প্রাপ্য), তার তুলনায় ৯০-এর অভ্যুত্থানকে একটি ‘ছোটখাটো ক্ষমতার পরিবর্তন’ হিসেবে দেখানোর প্রবণতা কাজ করে। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে এই অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক গুরুত্ব ঝাপসা হয়ে যায়।

স্থাপনার গুরুত্বহীনতা

যেসব স্থানে আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল (যেমন- জিরো পয়েন্ট বা ডা. মিলনের শাহাদাত বরণস্থল), সেগুলোকে কেবল নামমাত্র স্মৃতিফলকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে এবং বর্তমানের ফেরিওয়ালাদের জীবন জীবিকার স্থল কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত প্রধান কার্যালয়। এটি প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র এই অভ্যুত্থানের স্মৃতিকে দৃশ্যমান কোনও অনুপ্রেরণা হিসেবে টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী নয়।

স্লোগানের বিমূর্তায়ন

‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’— এই স্লোগানটি এখন কেবল পোস্টারের ভাষায় পরিণত হয়েছে। যখন সমাজ বা রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই স্লোগানের প্রতিফলন ঘটে না বরং ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়ন চলে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ৯০-এর চেতনা বিস্মৃতির গহ্বরে তলিয়ে যায়। একই ধরনের কর্মকাণ্ড কি ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে চলছে?

স্মৃতির ঘাতকদের কৌশল

বিস্মৃতির রাজনীতির এই নিদর্শনগুলো নির্বাচিত বিস্মৃতি কিংবা ইতিহাসকে ‘নির্বাচিত’ করা, নাম পরিবর্তন ও স্থাপনার গুরুত্বহীনতা, আর্কাইভ বা মহাফেজখানা ধ্বংস ও নিয়ন্ত্রণ, ‘অশুভ’ ও ‘শুভ’ ইতিহাসের বাইনারি তৈরি, পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে ‘প্রাতিষ্ঠানিক বিস্মৃতি’, শহীদত্বের বাণিজ্যিকীকরণ ও শ্রেণিবিন্যাস, আইনি বাধা ও সেন্সরশিপ এবং বিমূর্তায়ন করবার কাজ করে থাকে; রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রয়োজনে ইতিহাসের একটি অংশ মনে রাখে এবং অন্যটি মুছে ফেলে। সব মৃত্যুকে ‘শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে কেবল দলীয় স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ মৃত্যুকে মহিমান্বিত করা হয়। নির্দিষ্ট অপরাধীকে আড়াল করতে অপরাধকে একটি বিমূর্ত বা ভাগ্যলিপি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। স্মৃতির এই ঘাতকেরা মূলত চায় একটি ‘ইতিহাসহীন প্রজন্ম’ তৈরি করতে, যারা অতীতের অবিচার সম্পর্কে জানবে না এবং ফলস্বরূপ বর্তমানের অন্যায়ের প্রতিবাদ করার নৈতিক ভিত্তি খুঁজে পাবে না; স্মৃতির এই ঘাতকদের হাত থেকে বাঁচতে তাই ‘পাল্টা-স্মৃতি’ বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে ডায়েরি, স্বাধীন গবেষণা এবং সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চা অত্যন্ত জরুরি কিন্তু ধর্মতান্ত্রিক শব্দগুচ্ছ ‘শহীদ’ ও ‘ডেভিল হান্ট’-এর মতো শব্দগুলো, যা আইন ও ন্যায়বিচার থেকে আমাদের আরও দূরে নিয়ে যায়।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ

মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলাদেশের অস্তিত্বের ভিত্তি। কিন্তু গত পাঁচ দশকে এই স্মৃতিকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, তা ‘শিক্ষাগত সহিংসতা’ বা ‘শিক্ষাদান পদ্ধতিগত সহিংসতা’-এর একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। স্মৃতির ঘাতকরা ইতিহাসের একটি বিশাল প্রেক্ষাপটকে সংকুচিত করে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে নিয়ে আসে। বাংলাদেশে আমরা দেখেছি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দীর্ঘ সময় ধরে কেবল একটি রাজনৈতিক দল বা পরিবারের একক কৃতিত্বে রূপান্তরের চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে তাজউদ্দীন আহমদ, মওলানা ভাসানী, সাধারণ কৃষক-শ্রমিক এবং বামপন্থি মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইকে মূলধারার পাঠ্যপুস্তক থেকে কৌশলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এটি ছিল নির্বাচিত বিস্মৃতি কিংবা ইতিহাসকে ‘নির্বাচিত’ করা। বিগত হাসিনার ১৫ বছরে ‘মুক্তিযুদ্ধ’কে একটি চেতনার চেয়ে বেশি একটি ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যাকে আমরা স্মৃতির বিষাক্ত অস্ত্রায়ন বলতে পারি। যখনই কেউ সরকারের দুর্নীতি বা দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, তাকেই ‘রাজাকার’ বা ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দেওয়া হয়েছে এবং এটি এখনকার বহুল ব্যবহৃত তকমা। এতে একাত্তরের প্রকৃত ত্যাগ ও ইনসাফের চেতনাকে ব্যবহার করে বর্তমানের অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এটি একাত্তরের শহীদের স্মৃতির ওপর এক ধরনের ঘাতকবৃত্তি।

২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান

পাঠক অনুমতি দিলে বলতে চাই, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ছিল মূলত দীর্ঘদিনের চাপিয়ে দেওয়া ‘সুপরিকল্পিত বিস্মৃতি’র বিরুদ্ধে একটি প্রজন্মের বিস্ফোরণ। জুলাই আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বিভ্রাট ‘কল্পনাশক্তিনাশক যন্ত্র’ বা ‘চিন্তাশক্তি লোপকারী মাধ্যম’, যা মানুষের চিন্তাশক্তিকে স্থবির করে দেবার মাধ্যম মাত্র। আন্দোলনের সময় বাংলাদেশ সরকার যখন ইন্টারনেট বন্ধ করে দিলো এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে কেবল বিটিভি ভবন পোড়ানোর দৃশ্য দেখালো, তখন তারা আসলে মানুষের মস্তিষ্ক থেকে হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি মুছে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু তরুণরা তাদের মোবাইল ফোনের অফলাইন ভিডিও এবং পরবর্তীকালে ইন্টারনেট ফেরার পর ‘ডিজিটাল অ্যাক্টিভিজম’-এর মাধ্যমে সেই ঘাতকদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেয়। কিছু স্মৃতি ক্ষমতার জন্য এতটাই বিপজ্জনক যে রাষ্ট্র তা সহ্য করতে পারে না। আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি ছিল সেই ‘বিপজ্জনক স্মৃতি’। রাষ্ট্র প্রথমে একে অস্বীকার করতে চেয়েছিল, কিন্তু এটিই হয়ে উঠলো মুক্তির নতুন শিক্ষা।

ভবিষ্যৎ পথ

নতুন বাংলাদেশের তরুণরা এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। স্মৃতির ঘাতক ও বিস্মৃতির রাজনীতি তাত্ত্বিক কাঠামো অনুযায়ী, ‘স্মৃতির ঘাতকরা’ কখনোই পুরোপুরি বিদায় নেয় না, তারা কেবল রূপ পরিবর্তন করে। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়েও যদি রাষ্ট্রের নজরদারি (digital Surveillance) এবং গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত থাকে, তবে তা ডিজিটাল নজরদারিতে রূপ নেবে। নজরদারি মানুষের মনে ভয়ের সৃষ্টি করে, আর ভয় মানুষের প্রতিবাদী স্মৃতিকে অবদমন করে। যদি বর্তমান সরকারও নাগরিকের গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ করে নজরদারি চালায়, তবে তা হবে জুলাইয়ের ত্যাগের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

আদর্শিক বিস্মৃতি

তরুণদের নিজেদের দুর্নীতি ও ‘আদর্শিক বিস্মৃতি’র জন্য কঠোর সতর্কবার্তা রয়েছে—বিপ্লবীরাও অনেক সময় ঘাতক হয়ে ওঠে। যখন আন্দোলনের সামনের সারির কিছু তরুণ বা তাদের অংশবিশেষ ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে দখলদারত্ব, চাঁদাবাজি বা ভিন্নমতের ওপর হামলায় জড়িয়ে পড়ে, তখন তারা আসলে নিজেদের করা আন্দোলনের স্মৃতিকেই অপবিত্র করে; যাকে আমরা ‘নৈতিক বিলোপ’, ‘নৈতিকতা মুছে ফেলা’ বা ‘নৈতিকবোধের অবসান’ বলে ডাকনাম দিতে পারি। ক্ষমতার মোহে যদি ইনসাফের কথা ভুলে যাওয়া হয়, তবে জুলাইয়ের রক্ত অচিরেই কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ হয়ে যেতে বাধ্য; হয়ে গিয়েছে কি কিংবা ‘স্মৃতির ঘাতক’ হিসেবে পরিচিত হবেন কে কে কিংবা কারা কারা?

পোস্টার যুদ্ধ

অপরদিকে, বিস্মৃতির রাজনীতিতে পোস্টার যুদ্ধ—কীভাবে রাষ্ট্রীয় স্থাপত্য ব্যবহার করে জনস্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বাংলাদেশে এখন কার ছবি থাকবে, কার নাম নেওয়া হবে—এই নিয়ে যে কাড়াকাড়ি, তা মূলত মানুষের মনে একটি ‘বিকল্প ইতিহাস’ ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। বর্তমান বাংলাদেশে যদি ভিন্নমতের শিক্ষকদের ওপর আক্রমণ হয় বা তাদের জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো হয়, তবে তা হবে ‘শিক্ষাঙ্গনের বিস্মৃতি’।

বিচারের নামে প্রতিশোধ

এখন যদি ঢালাওভাবে কাউকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ বা ‘ফ্যাসিস্ট’ ট্যাগ দিয়ে বিনা বিচারে হয়রানি করা হয়, তবে তা হবে আর এক ধরনের বিস্মৃতির রাজনীতি। এটি মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করবে—কে প্রকৃত অপরাধী আর কে নয়। বিচারের নামে প্রতিশোধ নেওয়া হলো স্মৃতির ওপর আর এক ধরনের আঘাত; গুম, খুন ও হত্যার বিচার করলে কি রাষ্ট্র কর্তৃক স্মৃতির ঘাতক ও বিস্মৃতির রাজনীতি ঠেকানো যাবে? আমি মনে করি, ন্যায়বিচার প্রয়োজন, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। গুম বা খুনের বিচার না হওয়া মানে সেই অপরাধকে বৈধতা দেওয়া। বিচারহীনতা হলো বিস্মৃতির চূড়ান্ত রূপ। প্রতিটি গুম হওয়া ব্যক্তির কাহিনি যখন আদালতে এবং জনসমক্ষে আসবে, তখন রাষ্ট্র আর বলতে পারবে না যে ‘এসব কখনও ঘটেনি’। বিচার প্রক্রিয়া আসলে একটি ‘প্রতি-স্মৃতি’ বা ‘বিপরীত স্মৃতি’ তৈরি করে, যা ভবিষ্যতের স্বৈরাচারদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। কেন এটিই যথেষ্ট নয়? কেবল আইনি প্রক্রিয়ায় ঘাতকদের ঠেকানো যায় না। কারণ ক্ষমতা চিরকাল এক জায়গায় থাকে না। আসল লড়াইটি হতে হবে শিক্ষার মাধ্যমে। যদি বিচার হয় কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থায় আবার কোনও একপাক্ষিক ইতিহাস ঢোকানো হয়, তবে নতুন ঘাতক জন্ম নেবে। যদি বিচার হয় কিন্তু তরুণরা নিজেরা দুর্নীতিমুক্ত না হয়, তবে বিচার কেবল একটি প্রতিহিংসার হাতিয়ারে পরিণত হবে। যদি বিচার হয় কিন্তু রাষ্ট্র নজরদারি ও ভয়ের রাজনীতি বন্ধ না করে, তবে মানুষ আবার সত্য বলতে ভুলে যাবে।

স্মৃতির ঘাতকের চক্র

বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘স্মৃতির ঘাতক’রা বার বার ফিরে এসেছে। কখনও পাকিস্তানি হুলিয়া হয়ে, কখনও দেশীয় স্বৈরাচারের রূপ নিয়ে। ২০২৪-এর অভ্যুত্থান আমাদের সুযোগ দিয়েছে সেই বিস্মৃতির রাজনীতিকে সমূলে উপড়ে ফেলার। বাংলাদেশে এখন এক ভয়াবহ সন্ধিক্ষণ চলছে। একদিকে আছে মুক্তির স্মৃতি, অপরদিকে আছে নতুন আধিপত্যবাদের হাতছানি। যদি আমরা সচেতন না হই, তবে অচিরেই আমাদের এই ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’র স্মৃতিও কোনও এক ‘বিস্মৃতির গুদামঘরে’ বন্দি হয়ে পড়বে।

ব্লগার হত্যাকাণ্ড ও হেফাজত কর্মীদের ওপর হত্যাকাণ্ড

একইভাবে, স্মৃতির ঘাতক এবং বিস্মৃতির রাজনীতি'র প্রেক্ষাপটে ব্লগার হত্যাকাণ্ড এবং হেফাজত কর্মীদের ওপর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে গভীর পাঠতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংকট ফুটে ওঠে। এখানে স্মৃতিকে কেবল মুছে ফেলা হয় না, বরং তাকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বিকৃত করা হয়। ব্লগার হত্যাকাণ্ডগুলো ছিল মূলত মুক্তচিন্তার ‘স্মৃতি’ এবং ‘পদ্ধতি’কে ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে মুছে ফেলার চেষ্টা। ‘স্মৃতির ঘাতক’ তত্ত্ব এখানে সরাসরি শারীরিক হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়। এই হত্যাকাণ্ডগুলোর পর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অনেক সময় ভিকটিমকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। তাদের লেখনীকে ‘স্পর্শকাতর’ হিসেবে চিহ্নিত করে সমাজ থেকে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানকে মুছে ফেলার একটি চেষ্টা ছিল, যা পরোক্ষভাবে ঘাতকদের বয়ানকেই বৈধতা দেয়।

একইভাবে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা বা পরবর্তী সময়ে হেফাজত কর্মীদের ওপর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগগুলো বাংলাদেশের স্মৃতির রাজনীতিতে একটি কার অঞ্চল হিসেবে কাজ করে। হিসাবের গরমিল ও তথ্য-বিস্মৃতি আলাপে নজর দিলে, কতজন মারা গিয়েছেন বা কী ঘটেছিল, তা নিয়ে তথ্যের ধোঁয়াশা তৈরি করা রাষ্ট্রীয় বিস্মৃতির রাজনীতির একটি অংশ। যখন কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগকে ‘অনিবার্য’ বা ‘জাতীয় স্বার্থ’ হিসেবে প্রচার করা হয়, তখন সমাজ সেই অংশের প্রতি সহানুভূতি হারিয়ে ফেলে এবং তাদের ওপর ঘটা অন্যায়কে ভুলে যেতে চায়। এটিই স্মৃতির রাজনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক—যেখানে একপক্ষকে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হয়। সেই একই চেষ্টা আওয়ামী লীগ করতে চেয়েছে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে, এখন দেখবার পালা হয়তো এনসিপি -বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা স্মৃতির ঘাতক এবং বিস্মৃতির রাজনীতির চর্চা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে করেন কিনা এবং করতে গেলে আমরা বিচারের দাঁড়িপাল্লা দিয়ে বিফলতা মাপতে পারবো তো? নাগরিকদের এখনকার বড় চ্যালেঞ্জ হলো, আওয়ামী লীগ যে বিস্মৃতির রাজনীতি চর্চা করেছে, তার প্রতিক্রিয়ায় যেন নতুন কোনও বিস্মৃতির রাজনীতি তৈরি না হয়। অর্থাৎ, সকল রাজনৈতিক পক্ষ—তা বিএনপি হোক, জামায়াত হোক বা অন্য কেউ— তাদের ওপর ঘটা অবিচারের প্রকৃত তথ্য ইতিহাসে নথিবদ্ধ করা।

উপসংহার

বিস্মৃতির রাজনীতির একটি বড় অস্ত্র হলো প্রতিপক্ষকে এমনভাবে চিত্রায়িত করা যাতে সমাজ তাদের প্রতি সহানুভূতি হারিয়ে ফেলে। গত দেড় দশকে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের প্রায়শই ‘সন্ত্রাসী’, ‘উন্নয়ন বিরোধী’ বা ‘দেশবিরোধী’ তকমা দিয়ে তাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাসকে জনগণের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। এটি এক ধরনের পদ্ধতিগত বিস্মৃতি। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সেই লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, কিন্তু চূড়ান্ত জয় আসবে তখন, যখন বাংলাদেশের প্রতিটি তরুণ নিজের চিন্তা ও কর্মে ‘স্মৃতির অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলবে। স্মৃতি হলো ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করার সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র। সেই অস্ত্রকে যেন আমরা ক্ষমতার মোহে ভোঁতা হতে না দিই; কেননা, বাংলাদেশ সমাজ একটি চিরস্থায়ী ‘বিস্মৃতির বৃত্তে’ আটকা পড়ে যাবার সম্ভাবনার মাঝে বন্দি। ১৯৭১-এর অপূর্ণ স্বপ্ন আর ২০২৪-এর নতুন আকাঙ্ক্ষা যেন একীভূত হয়ে একটি সত্যনিষ্ঠ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলে।

লেখক: গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী