গুম কমিশনের নথিপত্র ঝুঁকিতে: তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে সংরক্ষণ সংকট
গুম কমিশনের নথিপত্র ঝুঁকিতে, তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে

গুম কমিশনের নথিপত্র সংরক্ষণে সরকারি নির্দেশনার অভাব, তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে

গুম কমিশনের অতি গোপনীয় নথিপত্র ও স্পর্শকাতর তথ্যপ্রমাণ সংরক্ষণে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা না দেওয়ায় জাতীয় ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আইনগতভাবে কোন দপ্তরে এসব গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট রাখা হবে, তা এখনো অনিশ্চিত থাকায় মানবাধিকার কমিশনে অভিভাবকহীনভাবে পড়ে আছে আলামতগুলো। সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, যদি এসব তথ্যপ্রমাণ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে খোয়া যায়, তাহলে গুম সংক্রান্ত মামলার তদন্ত ও বিচার মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে যারা গুমের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত ডিজিটাল ডকুমেন্ট নতুন করে সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন হবে।

গুম কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যানের বক্তব্য

গুম কমিশনের নথিপত্র সংরক্ষণ প্রসঙ্গে কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বিলুপ্ত গুম কমিশনের নথিপত্র এবং গোপনীয় দলিল-দস্তাবেজ মানবাধিকার কমিশনের সচিবের জিম্মায় থাকার কথা ছিল। সুনির্দিষ্ট গন্তব্য চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত নথিপত্র তার হেফাজতেই থাকবে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমানে এগুলো কোথায়-কীভাবে আছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারছি না।’

২৪ কার্টনে যা সংরক্ষিত

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুম কমিশনে প্রভাবশালী গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সামরিক, বেসামরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক কর্মকর্তাকে তলব করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের অডিও-ভিডিও রেকর্ড, ফোনকল রেকর্ড, এসএমএস ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজসহ নানা আলামত সংগ্রহ করে কমিশন। গুম কমিশন বিলুপ্তির পর সাবেক সচিব কুদরত-ই-এলাহীর উদ্যোগে দাপ্তরিক ফাইল ও ডকুমেন্টভর্তি ২৪টি কার্টন মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এছাড়া কমিশনারদের ব্যবহৃত ৫টি ল্যাপটপ থেকে তথ্য মুছে সরকারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নথিপত্র সংরক্ষণে ঝুঁকি ও উদ্বেগ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ল্যাপটপ থেকে তথ্য মুছে দেওয়া হলেও সেগুলো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, যা গোপনীয়তা ফাঁসের ঝুঁকি বাড়ায়। মানবাধিকার কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, গুম কমিশনের নথিপত্র সংরক্ষণের দায়িত্ব তাদের নয় এবং পূর্ববর্তী কমিশন থেকে কোনো নির্দেশনা না দেওয়ায় তারা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। তারা জরুরি ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

সরেজমিন অবস্থা

কাওরানবাজারে মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয়ে গুম কমিশনের দলিলপত্র রাখা ৯১৭ নম্বর কক্ষে সাধারণ তালা ঝুলছে এবং বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। ভেতরে স্তূপ করে রাখা ফাইল, কাগজপত্র ও দড়ি বাঁধা কার্টন দেখা যায়। কমিশনের সচিব কুদরত-ই-এলাহী বলেন, সরকার শিগগিরই সিদ্ধান্ত দিতে পারে বা মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন হলে তারা ব্যবস্থা নেবেন।

সাবেক কমিশনারের প্রতিক্রিয়া

সাবেক কমিশনার ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, ‘গুম কমিশনের নথিপত্র নিয়ে আমাদের উদ্বেগ আছে, তবে গুমের শিকার ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের তুলনায় এটি তেমন কিছু নয়। আমরা দেখছি রাষ্ট্র এসব তথ্যপ্রমাণের কী করে।’

গুম কমিশনের পটভূমি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গুম কমিশন গঠন করে। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে কমিশন কাজ করে, কিন্তু বিলুপ্তির পর তিন সদস্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে নিয়োগ পান। পরে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল হলে তারা দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।