‘আমি নিজে দেখছি, কোস্টগার্ড আমার স্বামীকে নিয়া গ্যাছে। এহন তারা অস্বীকার করে।’ কথাগুলো বলছিলেন সুন্দরবন-সংলগ্ন বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জয়মনির ঘোল এলাকার মুক্তা খাতুন। এক মাসের বেশি সময় ধরে তাঁর স্বামী মিরাজ শেখ (৩০) নিখোঁজ। তিনি কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে তাঁর স্বামীকে গুম করার অভিযোগ করেছেন।
ঘটনার বিবরণ
স্বজনেরা জানান, মিরাজ সুন্দরবনে মাছ ধরার পাশাপাশি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাতেন। ১০ এপ্রিল বেলা ১১টার দিকে মাছ ধরে বাড়িতে এসে ঘুমান। সন্ধ্যার আগে অচেনা নম্বর থেকে কয়েকবার ফোন এলে তিনি বাড়ি থেকে বের হন। সন্ধ্যা সাতটার দিকে জয়মনির ঠোটা এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে থেকে মিরাজকে সাদাপোশাকে থাকা দুজন ধরে নিয়ে যান। খবর পেয়ে মিরাজের স্ত্রী মুক্তা ছুটে গিয়ে দেখেন, কোস্টগার্ডের স্পিডবোটে তুলে মিরাজকে মোংলার দিকে নেওয়া হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জয়মনির ঘোল ও ঠোটা এলাকার এক নারী ও তিনজন পুরুষের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁরা চারজনই মিরাজকে কোস্টগার্ডের স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। তবে তাঁরা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। মিরাজকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর মোটরসাইকেলটি দোকানি আল-আমিনের জিম্মায় রেখে যায়। পরে ২১ এপ্রিল কোস্টগার্ড সদস্য রবিন পরিচয়ে এক ব্যক্তি চাবি দিয়ে খুলে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান। যদিও ২২ এপ্রিল কোস্টগার্ডের কয়েকজন মোটরসাইকেলটি আবার নিয়ে আসেন।
আল-আমিন বলেন, দোকানের সামনে থেকে দুজন মিরাজকে ধরে নিয়ে যান। তাঁর দোকানের পেছনে মোটরসাইকেল রেখে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। প্রত্যক্ষদর্শী এক নারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘মিরাজ সেদিন গাড়ির (মোটরসাইকেল) দে নাইমে দাঁড়ালি দুডো লোক ধরে ধাক্কাইতে ধাক্কাইতে নিয়ে যায়। এট্টু সামনে তিতেল গাছতলায় নিয়ে লাডিভাঙ্গা বাড়ি মারছে। এরপর ধাক্কাইতে ধাক্কাইতে জেটি ঘাটে নিয়ে যায়। সেখানে একটা বোটে তুইলা মিরাজকে পিডায়। তখন ও চিক দেওয়ার লগে লগে আরেট্টা মুখ চাইপে ধরছে। পরে আরেক বোটে নিয়ে চইলে গেল। অনেকেই দেখছে।’ রাতে কীভাবে দেখলেন প্রশ্ন করলে বলেন, ‘পল্টুনে তিনডা বাতি ছেল। সবই ভালো চিনাইছে।’
পরিবারের প্রতিক্রিয়া
মিরাজের বোন লিজা ইসলাম বলেন, ‘পরদিন ১১ তারিখ আমরা মোংলার দিগরাজে কোস্টগার্ড অফিসে যাই। সেখানে আমরা ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে বলা হয়, “অভিযানে আছে, বিকালে আসেন।” বিকেলে তারা অস্বীকার করে—সেখানে মিরাজ নেই। সেই থেকে আমরা সবখানে দৌড়াচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘আমার বাবা অসুস্থ (পক্ষাঘাতগ্রস্ত)। চলতে পারে না। ভাইয়ের সাত বছরের একটা ছেলে আছে। ভাবি আর মা বাচ্চাডারে নিয়ে সবখানে দৌড়াইছে। কোনোখানে খোঁজ নেই।’
৮ মে মিরাজ শেখের সন্ধান চেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে মোংলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। তার আগে ২৩ এপ্রিল মোংলা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন স্ত্রী মুক্তা খাতুন। এ ছাড়া স্বামীর সন্ধান ও ঘটনার তদন্ত চেয়ে ১৪ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক, পুলিশ মহাপরিদর্শক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছেন মুক্তা খাতুন।
মুক্তা খাতুনের ভাষ্য, ‘আমরা কোনো খোঁজখবর পাইতেছি না। সে যাদি কোনো অপরাধ কইরে থাকে, অপরাধী হয়, তারে জেলে দেতে। এভাবে গুম করবে ক্যা? কী যে করছে, আমর তো জানি না।...আমরা এহন কী করব, আমাগো তো করার কিছু নাই।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেডার বয়স ৭ বছর। ছেলেডা অনেক কান্নাকাটি করে। কী করব? করার তো কিছু নেই! এই ১ মাস ১ সপ্তাহ হয়ে যায়, পথে পথে পাগলের মতো ঘুরি, খুঁজি! কোনোহানে সন্ধান পাইতেছি না।’
কোস্টগার্ডের বক্তব্য
মিরাজ শেখকে আটক বা ধরে নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার মাহবুব হোসেন। শনিবার সন্ধ্যা পৌনে সাতটায় হোয়াটসঅ্যাপে তিনি বলেন, ‘তাঁর সম্পর্কে আমাদের কাছে কোনো তথ্যই নেই। নিখোঁজের যে বিষয়টি বলা হচ্ছে, এটি জিডি হবার পর আমরা থানা থেকে জানতে পেরেছি। তাঁদের (মিরাজের পরিবারের) অভিযোগের কোনো সত্যতাও আমরা খুঁজে পাইনি।’
মিরাজ আদৌ নিখোঁজ হয়েছেন কি না বা কোথায় গেছেন, সে বিষয়ে জানা নেই দাবি করে মাহবুব হোসেন বলেন, ‘এখানে আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়, গত ২১ তারিখে আমরা সামাদ নামের এক ডাকাতকে ধরছিলাম। সুন্দরবনের ছোট সুমন বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড সামাদ জিজ্ঞাসাবাদে তাদের দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচজনের নাম বলে। ওই পাঁচজনের মধ্যে মিরাজের নামও ছিল। পরবর্তীতে গত ২২ এপ্রিল যৌথ বাহিনীর একটা অভিযান হয়। এ সময় আমরা ওই পাঁচজনের মধ্যে দুজনকে আটক করি। তখন মিরাজকেও খোঁজা হয়। কিন্তু সেদিন তাঁকে পাওয়া যায়নি। আর ২২ তারিখের ওই অভিযানের পর ২৩ তারিখ তাঁর পরিবার থানায় মিরাজ নিখোঁজ উল্লেখ করে জিডি করে।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘১০ তারিখে যদি নিখোঁজ হয়, ১২-১৩ দিন পর জিডি হবে? বিষয়গুলো খুবই সাসপেশিয়াস।’
লে. কমান্ডার মাহবুব হোসেন জানান, ঘটনাটি জানার পর সব বিষয়ে তদন্ত হয়েছে। সেদিন তাঁদের কোনো স্পিডবোট ওই দিকে যায়নি। সুন্দরবনে দস্যু দমনে কোস্টগার্ডের দুটি অভিযান চলছে। ওই অভিযান শুরুর পর কিছু স্বার্থান্বেষী মহল তাদের স্বার্থ রক্ষায় কিছু লোকজনকে প্রভাবিত করছে। তারা কোস্টগার্ডের সুনাম নষ্টের চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ১১ এপ্রিল দিগরাজে কোস্টগার্ডের অফিসে মিরাজের পরিবার খোঁজ নিতে যাওয়ার বিষয়টিও সঠিক নয় বলে দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমরা পরবর্তীতে মিরাজের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, সে ছোট সুমন বাহিনীর সঙ্গে জড়িত। মিরাজ ওই ডাকাত বাহিনীর রসদ সরবরাহকারী ছিল। তার বাবা মোস্তফা শেখও সুন্দরবনের আত্মসমর্পণকারী দস্যু। আমরা কাউকে আটকের পর ২৪ ঘণ্টার বেশি রাখতে পারি না। আমাদের এখানে কখনো কোনো আসামি বা আটক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করানোর রেকর্ড নেই। কোস্টগার্ডের নামে অন্য কেউ আটক করে নিছে কি না–তা–ও জানা নেই।’
স্থানীয় সূত্রে তথ্য
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিরাজকে ধরে নেওয়ার ১১ দিন পর ২২ এপ্রিল দুপুরে জয়মনির ঠোটা এলাকার বাচ্চু হাওলাদারকে (৪০) বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় কোস্টগার্ড ও র্যাবের যৌথ দল। ওই দিন রাতেই অস্ত্র মামলায় তাঁকে মোংলা থানায় হস্তান্তর করা হয় বলে জানিয়েছে বাচ্চুর পরিবার। বাচ্চু ও নিখোঁজ মিজান একই সঙ্গে সুন্দরবনে মাছ ধরতে যেতেন বলে দুই পরিবার প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছে। বাচ্চুর স্ত্রী সেলিনা বেগম জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারের পর তাঁর স্বামীর কাছে ‘সুমনের’ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়েছে। সুমন সুন্দরবনের একটি বনদস্যু বাহিনীর প্রধান।
একটি সূত্র বলছে, মিরাজের বিরুদ্ধেও ওই দস্যু বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। তবে পরিবার বলছে, কোনো ডাকাতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু এখন বনে যাইতে হলে তো তাঁদের (বনদস্যু) টাকাপয়সা দিয়ে যেতে হয়।
স্থানীয় লোকজন জানান, পুলিশ এলাকায় গিয়ে মিরাজের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছে। তাঁরা প্রত্যক্ষদর্শী বেশ কয়েকজনের বক্তব্য রেকর্ড করেছেন। ভিডিও ও লিখিত নিয়েছেন।
থানার বক্তব্য
মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মিরাজ শেখের নিখোঁজের বিষয়ে একটি জিডি হয়েছে। আমরা অনুসন্ধান করছি। এখন পর্যন্ত বলার মতো কোনো ফলাফল নেই।’ নিখোঁজের পরিবারের অভিযোগের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, মিরাজের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই।



