গ্রামীণ বিদ্যুৎ বৈষম্য: লোডশেডিংয়ের বোঝা গ্রামের মানুষের ওপর
গ্রামীণ বিদ্যুৎ বৈষম্য: লোডশেডিংয়ের বোঝা গ্রামে

বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের দায়ভার যেভাবে গ্রামীণ জনপদের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেটা শুধু অন্যায্য ও বৈষম্যমূলকই নয়; বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। সুপার এল-নিনোর প্রভাবে এ বছর গরমের তীব্রতা তুলনামূলকভাবে বেশি। বর্ষা মৌসুমেও অনেক জায়গায় ঠিকমতো বৃষ্টি হচ্ছে না, ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তাপপ্রবাহ চলছে।

গ্রামে ১২-১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই

বৈরী এই আবহাওয়ার মধ্যে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন অনেক এলাকায় ১২-১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে জনজীবনে। প্রচণ্ড গরমে তাঁরা ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না। শিশু ও বৃদ্ধরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মারাত্মক প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে।

বৈষম্যমূলক বিদ্যুৎ বিতরণ নীতি

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, গ্রাম ও শহরের মধ্যে বিদ্যুৎ বিতরণের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণকে একটি স্থায়ী নীতিতে রূপ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারগুলোর মধ্যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, গত ২৯ জুন রাত আটটায় সারা দেশে লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে শুধু আরইবির অধীন লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট। এর অর্থ, ওই সময় বিদ্যুতের ঘাটতির ৯৬ শতাংশ ছিল গ্রামাঞ্চলে। আরইবির গ্রাহকেরা ১৭-৪২ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের আওতায় থাকছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লোডশেডিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া

লোডশেডিং ও বৈষম্যমূলক বিদ্যুৎ-নীতির যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, সেটাও উদ্বেগজনক। দেশের বিভিন্ন জায়গায় মহাসড়ক অবরোধ, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে হামলা, দায়িত্বরত লাইন ক্রুদের মারধর, অফিস ঘেরাও, বকেয়া বিল আদায়ে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। নিরাপত্তা চেয়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি পুলিশের কাছে অনুরোধ করেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে আরইবির পাশাপাশি চারজন সংসদ সদস্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা থেকেই যায়।

বিক্ষোভের কারণ: ফুটবল থেকে কৃষি পর্যন্ত

এটা সত্যি যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিদ্যুতের গ্রাহকদের বিক্ষোভের একটি কারণ হলো, বিদ্যুৎ না থাকায় তাঁরা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে পাচ্ছেন না। তবে কৃষি উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে তাঁদের যে উদ্বেগ, সেটাও তাঁদেরকে বিক্ষুব্ধ করে তুলছে। আজ ২ জুলাই এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়ায় পরীক্ষার প্রস্তুতি ও পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে তাঁদের। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক কৃষক জমিতে ঠিকমতো সেচ দিতে পারছেন না। এয়ারফ্লো মেশিন বন্ধ থাকায় কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারছেন না; বাধ্য হয়ে পচা পেঁয়াজ পানিতে ফেলে দিচ্ছেন।

অতীতের ভুল নীতির খেসারত গ্রামের মানুষের ঘাড়ে

বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, তার পেছনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বড় দায় রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চাহিদার কথা না ভেবেই এবং জ্বালানির প্রাথমিক উৎস নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও বসিয়ে বসিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। এ ছাড়া জ্বালানিনীতিকেও আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়েছে। ফলে মহামারি, যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক যেকোনো সংকটে বড় চাপে পড়ে আমাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। ফলে একদিকে দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়াতে হয়, অন্যদিকে এর সুফল পায় না সাধারণ জনগণ। লুণ্ঠনমূলক ও আমদানিনির্ভর জ্বালানিনীতি থেকে বের হতে না পারলে এই বিষচক্র থেকে আমাদের মুক্তি নেই।

প্রশ্ন হচ্ছে, অতীতের ভুল নীতির খেসারত কেন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে? লোডশেডিং মানেই গ্রাম, এমন বৈষম্যমূলক নীতির অবসান হওয়া জরুরি।