প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে যাচ্ছেন। আগামী ২১ জুন তিনি একদিনের সফরে মালয়েশিয়া যাবেন। মালয়েশিয়ায় সফর শেষে চীনে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুই দেশ মিলিয়ে ছয় দিনের সফরে যাবেন তিনি। ২২ থেকে ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী চীনে অবস্থান করবেন। এরপর দেশে ফিরে আসবেন। দুই দেশের সফরকেই কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মালয়েশিয়ার সফর থেকে শ্রমবাজার নিয়ে সুখবর আসতে পারে বলে ধারণা করছেন সফর-সংশ্লিষ্টরা।
মালয়েশিয়া সফরের সম্ভাব্য অগ্রগতি
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে দুটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হতে পারে। আর সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা এবং অনিয়মিত কর্মীদের নিয়মিত করা। এছাড়া দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়াও বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা হবে। বাণিজ্যের মধ্যে অন্যতম আলোচনার বিষয় হিসেবে থাকবে হালাল পণ্য রফতানি।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে আগামী ২১ থেকে ২২ জুন কুয়ালালামপুর সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়ার উদ্দেশে আগামী ২১ জুন বিকালে রওনা হবেন তিনি। মূলত সফরের আনুষ্ঠানিক পর্ব ২২ জুন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ২২ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। দুই সরকার-প্রধানের বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হতে পারে। এছাড়া বৈঠকে মূল আলোচনায় থাকবে শ্রমবাজার।
ওই কর্মকর্তা বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নানা কারণে এই শ্রমবাজার স্থবির হয়ে আছে। আসন্ন ওই বৈঠক থেকে এই শ্রমবাজার সচল করার বিষয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরির কথা বলেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। সোমবার (১৬ জুন) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে শ্রমবাজার সংক্রান্ত এক সভা শেষে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ আছে। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিস্তারিত তুলে ধরবেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আল সিয়াম। দুই-একদিনের মধ্যে এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হবে।
চীন সফরের গুরুত্ব
মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের উদ্দেশে রওনা হবেন। এই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক কোনদিকে এগোবে, তা জানা যাবে আসন্ন এই সফরে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে বলছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং—উভয়ের সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা আছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে বেইজিং সফর করেছেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। তিনি চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুয়া চুনইংয়ের সঙ্গে তারেক রহমানের চীন সফরের নানা কর্মসূচি, আলোচ্যসূচি, সম্ভাব্য চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে আগেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি টিম এই মুহূর্তে চীনে অবস্থান করছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, সফরে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং পররাষ্ট্র সচিবসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন।
প্রধানমন্ত্রী আগামী ২৩ জুন দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্সে অংশ নেবেন। সেখান থেকে ২৪ জুন বিকালে বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা হবেন। এই পথে তিনি বুলেট ট্রেনে যাত্রা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, জ্বালানি সহযোগিতা, চীনা শিল্প বাংলাদেশে স্থানান্তর, অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু করা, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং গুয়াংজু-চট্টগ্রাম ও সাংহাই-চট্টগ্রাম সরাসরি বিমান ফ্লাইট চালুর বিষয়গুলো আলোচনার এজেন্ডায় আছে।
এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মুক্তবাণিজ্য জোট রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি), ব্রিকস এবং অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থা সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে (এসসিও) বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বিষয়ে চীনের সমর্থন চাওয়া হবে। এছাড়া, চীনের অর্থায়ন ও সহায়তায় বাংলাদেশে যেসব বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প চালু রয়েছে, সেগুলোর অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হবে।
কূটনৈতিক সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে নীলফামারীতে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। চীন এই প্রকল্পে অনুদান বা গ্র্যান্টের মাধ্যমে অর্থায়ন করবে বলে আশা করছে ঢাকা। ‘মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চীনের সঙ্গে একটি চুক্তি সই করতে পারে বাংলাদেশ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই প্রকল্পের জন্য চীনা অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভারতের আপত্তির কারণে আর কোনও অগ্রগতি হয়নি।
এছাড়া সরকার তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্যও চীনের অর্থায়ন চাইতে পারে।



