গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরার পরিবেশ আর নেই: প্রধানমন্ত্রী
গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরার পরিবেশ আর নেই: প্রধানমন্ত্রী

দেশে বর্তমানে গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরার পরিবেশ আর 'নেই' বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাশাপাশি 'প্রতিশোধের মানসিকতা' বদলাতে বলেছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকালে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এই মন্তব্য করেন।

কালো দিবসের প্রসঙ্গ

প্রতিবছর ১৬ জুন বাংলাদেশে সংবাদপত্রের 'কালো দিবস' হিসেবে পালিত হয়। ১৯৭৫ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তৎকালীন সরকার চারটি সরকারি প্রচারপত্র বাদে দেশের সব পত্রিকার প্রকাশনা ও ডিক্লারেশন বাতিল করে দেয়। এর প্রতিবাদে পরবর্তী বছর থেকে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম কর্মীরা দিনটিকে 'কালো দিবস' হিসেবে পালন করে আসছেন।

সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আজকের এই দিনে একসময় বাংলাদেশের মাত্র চারটি সংবাদপত্র বাদে সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বহুদলীয় গণতন্ত্র। একই সময়ে সব রাজনৈতিক দলকে বিলুপ্ত করে ''বাকশাল'' গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু আজ সেই কালো দিবসেই আমরা সাংবাদিকদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলছি। এর অর্থ একটাই, সংবাদপত্রের কণ্ঠ যেভাবে চেপে ধরা হয়েছিল, সেটি অন্তত এই মুহূর্তে আর নেই।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছিলেন এবং সংবাদপত্রের ওপর থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিলেন বলেও এ সময় উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রতিশোধের মানসিকতা বদলানোর আহ্বান

মতবিনিময় সভায় রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের 'প্রতিশোধের মানসিকতা' থেকে সবাইকে বেরিয়ে এসে দেশের উন্নয়নে ইতিবাচক কাজ করার আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, 'আমরা আমাদের নিজেদের চিন্তা কিছুটা পরিবর্তন করার চেষ্টা করি। আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে, কিন্তু আপনি এখন প্রতিশোধ নিলেই কি আপনার সেই ক্ষতিপূরণ হবে বা সবকিছু আগের মতো হয়ে যাবে, না। তাহলে আমরা সেই প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে ভাবি যে, আমরা দেশের জন্য, সমাজের জন্য বা মানুষের জন্য কী করতে পারি। সফল হওয়া বা না হওয়া পরের ব্যাপার, অন্তত এই মানসিকতা নিয়ে কেন আমরা সামনের দিনে এগিয়ে যাব না?'

যুবসমাজকে মাদক থেকে রক্ষা

দেশের যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে দেশব্যাপী খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতার ওপর বিশেষ জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, শুধু চিকিৎসা বা কাউন্সেলিং দিয়ে এই সংকট দূর করা সম্ভব নয়, কারণ, রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মানসিক ও শারীরিক শক্তিকে ইতিবাচক খাতে ব্যবহার করতে হবে।

তরুণদের জন্য সরকার ইতিমধ্যে 'নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস' ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা চালু করেছে, যেখানে দেশের প্রায় ২২ লাখ ছেলে-মেয়ে অংশ নিয়েছে বলেও এ সময় উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিজ্ঞান মেলা

শুধু নির্দিষ্ট কিছু জাতীয় দিবস (যেমন—১৬ ডিসেম্বর বা ২১ ফেব্রুয়ারি) ছাড়া কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সারা বছর সাংস্কৃতিক বা বিতর্ক প্রতিযোগিতা হয় না, সেই প্রশ্ন তুলে প্রধানমন্ত্রী এই চর্চা সারা বছর চালু রাখার তাগিদ দেন। একই সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মেধা বিকাশে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে উদ্ভাবনী মেলা (সায়েন্স ফেয়ার) আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেন এবং এসবের বেশি বেশি প্রচার নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন।

সামাজিক মূল্যবোধ ও নিষ্ঠুর আচরণের সমালোচনা

সাম্প্রতিক সময়ে সমাজে ছড়িয়ে পড়া কিছু নিষ্ঠুর আচরণের তীব্র সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকাল একটা জীবন্ত প্রাণীকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে এবং অনেকে মিলে তা মোবাইলে রেকর্ড করছে, যা চরম এক অস্বাভাবিক মানসিকতা। স্কুল পর্যায় থেকেই সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে তথ্য মন্ত্রণালয়কে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করার নির্দেশনা দেন তিনি।

অর্থনৈতিক সংস্কার ও ফ্যামিলি কার্ড

এ ছাড়া সভায় দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ এবং সরকারের প্রস্তাবিত 'ফ্যামিলি কার্ড' ও 'কৃষক কার্ড'-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

ফুটবল বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ

গম্ভীর আলোচনার পাশাপাশি মতবিনিময় সভায় উঠে আসে চলতি ফুটবল বিশ্বকাপের প্রসঙ্গও। পুরো দেশ যখন ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনায় বিভক্ত, তখন এক সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান—তিনি কোন দলকে সমর্থন করেন। সরাসরি কোনো দলের নাম না নিয়ে মৃদু হেসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জবাব দেন, 'আমি দীর্ঘদিন একটি দেশে (ইংল্যান্ড) ছিলাম, বুঝতেই পারছেন। আপনি আপনার উত্তর পেয়েছেন তো?'

অনুষ্ঠানে উপস্থিতি

প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, স্পিচ রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমান, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু, সুজাউদ্দৌলা সুজন ও শাহাদাত হোসেন স্বাধীনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সিনিয়র সাংবাদিকেরা।