গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে সরকার সহযোগী অংশীদার: তথ্যমন্ত্রী
গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় সরকার সহযোগী অংশীদার: তথ্যমন্ত্রী

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, অতীতে ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী যুগে রাষ্ট্র গণমাধ্যমের দিকে চোখ রাঙিয়ে কথা বলত। তবে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের পেশাগত সমস্যা সমাধানে প্রকৃত ‘সহযোগী অংশীদার’ হিসেবে কাজ করতে চাই।

‘সংবাদপত্রের কালো দিবস’ আলোচনা সভা

মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত ‘সংবাদপত্রের কালো দিবস’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বিশেষ বক্তা হিসেবে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘১৬ জুন সংবাদপত্রের কালো দিবস। গণমাধ্যমের সংকট এবং সাংবাদিকতা পেশার কালো পরিবেশ এখন একাকার হয়ে গেছে। তাই কেবল ৫০ বছর আগের সমস্যার আলাপের মধ্যে নিজেদের আটকে না রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল মাধ্যমের নতুন চেহারা ও চ্যালেঞ্জ অনুধাবন করে তার উদ্ভাবনী সমাধান বের করতে হবে।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও ফ্যাসিবাদের ভাইরাস

ইতিহাসের প্রেক্ষাপট টেনে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনী অন্তর্ভুক্তের মাধ্যমে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল চেতনাকে হত্যা করে একদলীয় শাসন কায়েম করা হয়েছিল। সেদিনের স্বৈরাচারী শাসকরা বুঝতে পেরেছিল, জনগণের কণ্ঠস্বর ও ক্ষোভ রোধ করতে গণমাধ্যমকে গলা টিপে হত্যা করতে হবে নতুবা তারা রক্ষা পাবে না। সে কারণে ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন তারা সংবাদপত্রের কণ্ঠস্বরকে আনুষ্ঠানিকভাবে হত্যা করেছিল।

তিনি আরও বলেন, ‘অতীতে পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিবাদের ভাইরাসের জীবনী আমাদের ভালো করে পাঠ করা দরকার। আমাদের মনের অজান্তে লুকিয়ে থাকা স্বৈরাচারী মানসিকতার বিরুদ্ধে তা ‘অ্যান্টিভাইরাস’ হিসেবে কাজ করবে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নাগরিক সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ

তথ্যপ্রযুক্তির বর্তমান চরিত্র তুলে ধরে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ৫০ বছর আগে কেবল ছাপার অক্ষরের গণমাধ্যম ছিল। কিন্তু এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ঘরে বসেই প্রতিনিয়ত সত্য কিংবা বিকৃত তথ্য উৎপাদন করা যাচ্ছে। পরে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বর্তমান প্রযুক্তির অপব্যবহারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিগত সংকটের নতুন চেহারা আমাদের অনুধাবন ও সমাধান করতে হবে। এর বাইরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ‘সিটিজেন জার্নালিজম’ বা নাগরিক সাংবাদিকতার বাস্তবতাকে অস্বীকারের সুযোগ নেই, বরং একে কাঠামোবদ্ধ করতে হবে। এই লক্ষ্যে ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নতুন আইন প্রণয়ন করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মিডিয়া মালিকদের দায়িত্ব ও সরকারের পদক্ষেপ

মন্ত্রী বলেন, সরকার যতই স্বাধীনতা দিক না কেন, মিডিয়া মালিকরা যদি স্বাধীনতা ও সঠিক বেতন-ভাতা না দেয় এবং মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ না রাখে, তবে সাংবাদিকরা স্বাধীন হতে পারবে না। রাষ্ট্রকে অবশ্যই সাংবাদিকদের পেশাগত আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যে গণমাধ্যম নিজেকে ‘শিল্প প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে দাবি করবে, তাকে অবশ্যই দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরিচালিত হতে হবে। একই সঙ্গে কর্মচারীদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে মুনাফাভিত্তিক শিল্পের বাইরে যেসব গণমাধ্যম কেবল জনকল্যাণে নিয়োজিত থাকবে, তাদের রাষ্ট্র বিশেষ প্রণোদনা বা ইনসেনটিভ এবং সহযোগিতা দেবে।

গণমাধ্যম কমিশন গঠনের ঘোষণা

তথ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার ইতোমধ্যেই এডিটরস কাউন্সিল ও টেলিভিশন অ্যাসোসিয়েশনসহ সব অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। খুব শিগগিরই কোয়াসি-জুডিশিয়াল (আধা-বিচারিক) ক্ষমতাসহ একটি শক্তিশালী ‘গণমাধ্যম কমিশন’ গঠন করা হবে, যা ফ্যাসিবাদ-উত্তর বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হবে।

প্রধান অতিথি ও বিএনপি মহাসচিবের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য সরকারে একটি উচ্চপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ‘নীতি নির্ধারণী ফোরাম’ রাখা দরকার, যা তথ্য মন্ত্রণালয়কে নিয়মিত গাইড করবে।

তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যম যদি সঠিক নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রকে সবসময় প্রশ্নের মুখোমুখি রাখতে পারে, তবে রাষ্ট্র ও সরকার কোনো ভুল করতে পারবে না, দেশ সঠিক পথে এগিয়ে যাবে।’