বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাস পূর্ণ হতে চলেছে। নির্বাচনের আগে থেকে বিএনপি 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতি গ্রহণের কথা জানিয়েছিল। সরকার গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই পররাষ্ট্রনীতিতে এই নীতির স্পষ্ট বার্তা পাওয়া গেছে। গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথম বিদেশ সফর করেন, যেখানে এক যাত্রায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সফর ও একটি বহুপক্ষীয় সম্মেলনে অংশ নেন তিনি।
বাণিজ্যিক ফ্লাইটে সফর ও সীমিত প্রতিনিধি দল
অন্যান্য সরকারপ্রধানদের মতো চার্টার্ড ফ্লাইট নয়, বরং নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে তিনি দেশ ছেড়েছেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত লোকজন নিয়ে বিদেশ সফরের রেওয়াজ থাকলেও, এখানে ব্যতিক্রম ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ করতে তাঁর সফরসঙ্গীর সংখ্যা ছিল ৩০-এর কম।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরগুলো ছিল অত্যন্ত অর্থবহ। পররাষ্ট্রে 'বাংলাদেশ ফার্স্ট পলিসি' এবং বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের অগ্রাধিকার ও আন্তরিকতা প্রতিফলিত হয়েছে। পুত্রজায়া থেকে দালিয়ান, সেখান থেকে বেইজিং—সবখানেই বিনিয়োগ টানার প্রচেষ্টা লক্ষ করা গেছে।
মালয়েশিয়া সফর: ১৮ ঘণ্টায় ৩৩ পয়েন্টের যৌথ বিবৃতি
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর ছিল ১৮ ঘণ্টার একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত ফলপ্রসূ সফর। ২২ জুন স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় পুত্রজায়ায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর একান্ত ও প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক হয়। এতে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর, উচ্চশিক্ষা, ভোকেশনাল ট্রেনিং, পর্যটন, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, সাইবার নিরাপত্তা এবং আধুনিক প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনিয়মিত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়মিতকরণ এবং ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের বিষয়টি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে দক্ষ শ্রমিক নিয়োগের অনুরোধ করেন। দুই দেশের আলোচনায় শরণার্থী প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পায়। মালয়েশিয়া এই সংকট সমাধানে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। বৈঠক শেষে দুই দেশের সম্মতিতে ৯টি বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩৩টি পয়েন্ট সংবলিত একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে পাঁচটি বড় মালয়েশিয়ান প্রতিষ্ঠান—পেট্রোনাস গ্রুপ, আজিয়াটা, এয়ার এশিয়া, পারোডুয়া ও এমএমসি করপোরেশন—বিনিয়োগের আগ্রহ নিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে। তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও পরিকল্পনা জানায় এবং দ্রুত বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ প্রকাশ করে। প্রধানমন্ত্রী তাদের সরকারের ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব নীতির বিষয়ে আশ্বস্ত করেন।
গ্রীষ্মকালীন দাভোস: জলবায়ু নেতৃত্ব ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বহুপক্ষীয় সফর হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ১৭তম ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোস’-এ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। ২৩ জুন তিনি ডব্লিউইএফ-এর প্রেসিডেন্ট ও সিইও আলোইস জভিংগি-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের মতো ডেল্টা রাষ্ট্র এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য সহযোগিতামূলক উদ্যোগ গ্রহণে ডব্লিউইএফ-কে সমন্বিত ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। আলোইস জভিংগি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগকে বৈশ্বিক পর্যায়ে কাজে লাগানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন প্রধানমন্ত্রী ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন আ শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক সেশনে বক্তব্য দেন। তিনি জলবায়ু–সহনশীলতা তৈরিতে অংশীদারত্ব, প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং যৌথ অঙ্গীকারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। জলবায়ু ‘ক্ষয়ক্ষতি তহবিল’কে প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নে আনা, ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন সহজলভ্য করা এবং সবুজ জলবায়ু তহবিলকে (জিসিএফ) কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। প্রশমন কার্যক্রমের পাশাপাশি অভিযোজন কার্যক্রমকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন এবং বাংলাদেশকে জলবায়ু সহনশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
এই সম্মেলনে ৯০টিরও বেশি দেশের প্রায় ১ হাজার ৭০০-এর বেশি সরকারি প্রতিনিধি, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ কোরিয়া, মঙ্গোলিয়াসহ সাতটি দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকটেনভের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। বৈঠকে ঢাকা ও আস্তানায় স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন স্থাপন, বাংলাদেশ থেকে কাজাখস্তানে দক্ষ শ্রমিক পাঠানো, জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। জাতিসংঘের অধীনে একটি বিশেষায়িত সংস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কাজাখস্তানের প্রস্তাবে বাংলাদেশের সমর্থন প্রত্যাশা করেন প্রধানমন্ত্রী বেকটেনভ।
চীন সফর: ৯০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব
বেইজিং পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোওইং-এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন। সেখানে পানিসম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও দুই দেশের সম্পৃক্ততার ওপর জোর দেওয়া হয়। তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনা, বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা, নদী খনন, নদীভাঙন রোধ, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়।
মালয়েশিয়া সফরের মতো চীন সফরেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা সাক্ষাৎ করেন। মেগারিচ কোম্পানি, হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজ, চেরি অটোমোবাইল কোম্পানি লিমিটেডসহ অন্তত ১২টি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও পরিকল্পনা জানান। এসব প্রস্তাবের সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ ৯০০ কোটি মার্কিন ডলারের (প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা) বেশি।
প্রধানমন্ত্রী ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত এবং চীনের সঙ্গে আরও গভীর শিল্প অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী। তিনি চীনা কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে তাদের ভ্যালুচেইন সম্প্রসারণের আহ্বান জানান এবং শিগগিরই চীনে বাংলাদেশের প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ চালুর উদ্যোগের কথা জানান।
এ ছাড়া চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান, বিনিয়োগকারী, মন্ত্রী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের নতুন রূপরেখা
প্রধানমন্ত্রী চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে পৃথক বৈঠক উল্লেখযোগ্য। উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে অনুষ্ঠিত এসব বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ভিত্তি হিসেবে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান, সহযোগিতা এবং উভয় দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়।
দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে ১৩টি দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পর্যায়ে, তিনটি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এবং একটি বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে সম্পন্ন হয়।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও কৌশলগত সহযোগিতা
রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে বাংলাদেশ তার দীর্ঘদিনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে—নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন চায় বাংলাদেশ। এ বিষয়ে চীন বাংলাদেশকে সহযোগিতা করার এবং প্রয়োজন হলে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনায় সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ সহযোগিতা কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর আওতায় দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র নির্ধারণ করবেন।
ভবিষ্যৎ সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের বহুমুখী কূটনীতির একটি নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে। ভবিষ্যতে বিনিয়োগ, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় এসেছে এবং তাদের প্রত্যাশা পূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিনিয়োগ, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার এই সফরের প্রতিটি স্তরে প্রতিফলিত হয়েছে। নিজস্ব কৌশলগত স্বকীয়তা বজায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব প্রতিফলন এই সফরগুলোতে দেখা গেছে, যা দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।



