কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের 'ইসরাইলি মডেল' অনুসরণ: বিশ্লেষণে উঠে এলো নতুন তথ্য
ভারতের বর্তমান নরেন্দ্র মোদি সরকার এবং ইসরাইলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা কেবল অস্ত্র আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন ভারতের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থায় 'ইসরাইলি মডেল' অনুসরণের দিকে ঝুঁকছে বলে আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রবণতা বিশেষ করে জম্মু-কাশ্মীর নীতি, নজরদারি প্রযুক্তি এবং 'বুলডোজার বিচার'—এই তিনটি ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে।
ইতিহাস ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
২০১৯ সালে নিউইয়র্কে ভারতের তৎকালীন কনসাল জেনারেল সন্দীপ চক্রবর্তী কাশ্মীর ইস্যুতে 'ইসরাইলি মডেল' গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আহ্বান আরও বাস্তব হয়ে উঠেছে। ফিলিস্তিনের অধিকৃত অঞ্চলে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের মতোই কাশ্মীরে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে, যা অনেকে ইসরাইলের 'সেটলার কলোনিয়ালিজম' বা বসতি স্থাপনমূলক উপনিবেশবাদের ছায়া হিসেবে বিবেচনা করছেন।
আদর্শিক মিল ও রাজনৈতিক প্রভাব
বিজেপি সরকারের 'হিন্দুত্ব' মতাদর্শ এবং ইসরাইলের 'জায়নবাদ'-এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য আদর্শিক সাদৃশ্য রয়েছে। উভয় পক্ষই নিজেদের একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর 'স্বাভাবিক জন্মভূমি' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এই আদর্শিক মিল ভারতের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে 'বুলডোজার নীতি'র মাধ্যমে।
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে 'বুলডোজার নীতি' একটি আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পদ্ধতিতে কোনো অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বাড়ি বা দোকান আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, যা মূলত অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের প্রয়োগ করা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার একটি সংস্করণ। যদিও ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া এ ধরনের উচ্ছেদে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে উত্তরপ্রদেশসহ বেশ কিছু রাজ্যে এর প্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে।
প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা কৌশল
ইসরাইলি স্পাইওয়্যার 'পেগাসাস' ব্যবহার করে সাংবাদিক ও বিরোধীদের ওপর নজরদারির অভিযোগ ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে ইসরাইলি দমনমূলক কৌশলের প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করেছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারত বর্তমানে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা, এবং গাজা যুদ্ধের সময় ভারতকে ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ করতেও দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত এখন কাশ্মীর বা অন্যান্য উত্তপ্ত অঞ্চলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তাকে ইসরাইলি দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শুরু করেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজ দেশের নাগরিকদের অনেক ক্ষেত্রে 'বাহ্যিক হুমকি' হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা ভারতের ঐতিহ্যগত ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে।
ভবিষ্যত সম্ভাবনা
মোদি সরকারের এই 'ইসরাইল প্রেম' ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অবস্থানকে পরিবর্তন করছে। এটি অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থায় একটি কঠোর সামরিক ও কর্তৃত্ববাদী কাঠামো তৈরি করছে বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন। এই পরিবর্তন ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত-ইসরাইল সম্পর্কের এই নতুন মোড় কাশ্মীর ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এখন এই উন্নয়নের দিকে, যা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
