প্রায় মাসখানেক ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এক রোগিণী। ম্যাসিভ স্ট্রোকের পর শারীরিক অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। চিকিৎসকরা সব চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরা চেয়েছিলেন রোগিণীকে কোনো রিহ্যাব ফ্যাসিলিটিতে স্থানান্তর করতে, কারণ হাসপাতালে আর থাকলে তাঁর কোনো লাভ হবে না, বরং ক্ষতি হতে পারে। রোগিণীর চার সন্তানের মধ্যে তিনজন বিষয়টি মেনে নিলেও বড় মেয়ে, যিনি একজন আইনজীবী, তিনি রাজি হননি।
বৃষ্টির দিনে দেখা
দিনটি ছিল বৃষ্টিমুখর। সপ্তাহের প্রথম কাজের দিন। রোগিণী মাসখানেক হাসপাতালে থাকলেও ডাক্তারের রোগী ছিলেন না; এদিনই প্রথম দেখা। সকাল থেকে নার্সরা জানাচ্ছিলেন, রোগীর মেয়ে এসে বসে আছেন। ডাক্তার বারবার বলছিলেন, অন্য রোগীদের দেখে নিচ্ছেন, নির্দিষ্ট সময় বলতে পারছেন না। বিকেলে বৃষ্টি শুরু হলে তিনি রোগিণীর রুমে গেলেন।
মেয়ের অভিযোগ
রোগীর মেয়ে বসে ছিলেন। ডাক্তারকে দেখেই বললেন, 'সারা দিনে তোমার এখন সময় হলো? আমার মায়ের এটা লাগবে, নার্সরা অমুক জিনিস চেষ্টা করছে না।' রোগিণী নিথর পড়ে ছিলেন। পরীক্ষা শেষে ডাক্তার তাঁকে বারান্দায় ডেকে নিয়ে গেলেন।
পথশিশুর জীবন থেকে আইনজীবী
বারান্দায় বসে মেয়ে তাঁর জীবনের গল্প বললেন। 'আমার বয়স তখন ১০ বছর, পথে থাকি। আমি পথশিশু ছিলাম। একদিন এক লোক সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্ট করছেন। এক বক্স খাবার দিয়ে এক বাচ্চাকে ডেয়ার করেছেন, খাবার পথে ফেলে দিলে ১০ ডলার দেবেন। বাচ্চা খাবার ফেলে দিল। আমি খাবারগুলো তুলে মুখে দিতে যাচ্ছি, এমন সময় এক মহিলা দৌড়ে এসে বললেন, 'তুমি নিচের খাবার খেয়ো না, অসুখ হবে।' তিনি আমাকে দোকানে নিয়ে গিয়ে খাওয়ালেন। তারপর বললেন, 'কোথায় থাকো?' আমি বললাম পথেই থাকি। তিনি ফোন করে আমার জন্য শেল্টারের ব্যবস্থা করলেন এবং বললেন, 'তোমাকে আমি অ্যাডপ্ট করব। যদি পছন্দ না হয়, যেকোনো দিন চলে যেতে পারো।'
পরে জানতে পারি, তিনি শহরের সেরা আইনজীবী। তিনি শুধু আমাকে অ্যাডপ্টই করেননি, চার সন্তানের মা হওয়ার পরও আমাকে সবকিছুতে সমান অধিকার দিয়েছেন। আমি অনেক ঝামেলা করেছি, মাতাল হয়ে গাড়ি চালিয়ে জেল খেটেছি, কিন্তু মা ভরসা হারাননি। চার বছর আগে আইনজীবী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি পুরো খরচ দিয়েছেন। আমি বদলে গেছি। মাসখানেক আগে পড়া শেষ করেছি, আর মা কোমায় চলে গেছেন। ডাক্তার, আমি কিছু শুনতে চাই না, তাঁকে ফিরিয়ে আনো।'
শেষ ইচ্ছা
ডাক্তার বললেন, 'যে মানুষটা এত ভালো, তাঁকে বছরের পর বছর কষ্ট দিয়ে বিছানায় ফেলে রাখবেন? সন্তান হিসেবে সেটা কি ঠিক হবে?' পরদিন ভিডিও অ্যাসিস্টেড লিপ রিডার নিয়ে রোগীর কাছে গেলেন। মেয়ে মাকে বললেন, 'মা, ফিরে আসুন। আমি বদলে গেছি। আপনার কষ্ট বৃথা যায়নি। এই পথশিশু এখন নিজেও ভালো থাকবে আর অন্য পথশিশুকে সাহায্য করবে।'
হঠাৎ লিপ রিডার চিৎকার করে বললেন, 'ডাক্তার, রোগী বলছেন, আমি জানতাম, তুই পারবি। এখন আমাকে যেতে দে মা।' পরপর অ্যালার্ম বাজতে শুরু করলো। ডাক্তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আপনি চান, আমরা চেস্ট কম্প্রেশন শুরু করি?' তিনি তাকিয়ে বললেন, 'না। আমার মাকে আর কোনো কষ্ট দেব না।' অন্য চার ভাইবোন বড় বোনকে জড়িয়ে ধরলেন।
ডাক্তার বারান্দায় এসে চোখ মুছলেন। তাঁর নিজের মা হাজার মাইল দূরে, যিনি একই রকম কষ্ট করে তাঁকে মানুষ করেছেন। আব্বু নেই। তাঁর হাত ধরে বসে থাকতে ইচ্ছা করছে। তিনি লিখলেন, 'শান্ত হয়ে যাও পৃথিবী। শত রক্ত–গোলাপ হাতে কোনো এক সকালে আমিও বলতে চাই, আম্মি, ভালোবাসি আপনাকে, অনেক। পৃথিবীর সব মা ভালো থাকুন।'



