দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা দাবি করে আসছে। কিন্তু ন্যায্য পানি প্রাপ্তিতে ভারতের সঙ্গে চুক্তি জরুরি। চুক্তির খসড়া তৈরি করেও তা সই করা হয়নি, কারণ বিরোধিতা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। ১৫ বছরের বিরোধের পর এখন পশ্চিমবঙ্গে যখন রাজনীতির হাওয়া পাল্টে তৃণমূল কংগ্রেসের কাছ থেকে ক্ষমতা গেছে বিজেপি’র হাতে, তখন আলোচনা জেগেছে—এবার কি বাংলাদেশ তিস্তার পানি পাবে, হবে কিনা সেই চুক্তি।
২০১১ সালের খসড়া চুক্তি ও মমতার বিরোধিতা
২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সময় বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তির একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়। শুকনো মৌসুমে (ডিসেম্বর-মার্চ) পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ২০১১ সালে খসড়া চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ৩৭.৫ শতাংশ এবং ভারত ৪২.৫ শতাংশ পানি পাওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে এটি আর স্বাক্ষরিত হয়নি। দুই দেশের সরকারই ১৫ বছরের জন্য চুক্তি সই করতে সম্মত হলেও শেষ মুহূর্তে মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতায় সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
শুধু বিরোধ করেই ক্ষান্ত থাকেননি মমতা ব্যানার্জি, চুক্তি ঠেকানোর জন্য নানা উপায় অবলম্বন করেছেন। তিনি বিশেষজ্ঞ প্যানেল দিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন তৈরি করান এবং সেসব প্রতিবেদনে বলা হয়—কৃষকরা যতটা সেচের পানি আশা করছেন, আসলে তিস্তায় তার ১৬ ভাগের একভাগ পানিও নেই। প্রথম রিপোর্টে বাংলাদেশের বিষয়ে ইতিবাচক পরামর্শ থাকলেও তা প্রকাশ করেনি পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন সরকার। সেই প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট না হওয়ায় পুনরায় আবারও প্রতিবেদন তৈরি করানো হয় অন্য বিশেষজ্ঞ দিয়ে। মমতা ব্যানার্জি বরাবরই বলার চেষ্টা করেছেন যে তিস্তায় পানি নেই।
বিকল্প প্রস্তাব ও চলমান বাধা
তিস্তার পানিবণ্টনের বিরোধ করলেও মমতা প্রস্তাব দেন বিকল্প নদীর। ২০১৭ সালে তিস্তার সমস্যা মেটাতে তোর্সা, জলঢাকাসহ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি নদীর পানিবণ্টনের বিকল্প প্রস্তাব দেন মমতা। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, মমতার বিরোধের কারণে কোনও সরকারই তিস্তা চুক্তি নিয়ে এগোতে পারেনি। ২০২৪ সালেও তিস্তার পানি দিলে ভারতজুড়ে আন্দোলনের হুমকি দেন মমতা।
সিকিম থেকে উৎপত্তি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা নদী নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারী দিয়ে ১২৪ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। একসময় বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলার মানুষের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত এই নদী বর্তমানে পানিশূন্যতার কারণে মারাত্মক সংকটে পড়েছে। গত ১৫ বছরে যতবার মমতা ক্ষমতায় গেছেন, ততবারই তিস্তার পানি নিয়ে আশাহত হতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও বিজেপির জয়
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচন মাত্রই শেষ হয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও মমতার দল ৪২টি আসনের মধ্যে ২৯টি জিতে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছিল, যেখানে বিজেপি ১৮ থেকে ১২-তে নেমে গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী ২৩ মাসে কিছু সুনির্দিষ্ট ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের মন ঘুরিয়ে দিয়েছে—যার ফলে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবারই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে দলটি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তার পানি এখন রাজনৈতিক ইস্যু। আগেও তাই ছিল। বিজেপি ক্ষমতায় এলেও বিরোধী হিসেবে মমতা এখনও বিরোধিতা করবেন বলে ধারণা তাদের।
বিশ্লেষকদের মতামত
লেখক, গবেষক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, এতদিন দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা পানিবণ্টনের ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জির আপত্তির অজুহাত দিতো। এখন কেন্দ্র ও রাজ্য—উভয় জায়গায় একই দল ক্ষমতায় থাকায় বাংলাদেশ পানিবণ্টনের বিষয়ে জোরালো দাবি তোলার একটি পরিষ্কার সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি গঙ্গাচুক্তির নবায়ন ও ভিসা সমস্যা সমাধানের বিষয়েও আলোচনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ''পশ্চিমবঙ্গে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট আর প্রাদেশিক গভর্নমেন্টে দুই দল থাকায় এই অভিযোগটা বা এই অজুহাতটা দেখাতে পারতো আগে। এখন যেহেতু সেন্টারে এবং প্রদেশের একই দলের সরকার—যেটাকে ওরা বলে 'ডাবল ইঞ্জিন' সরকার, এতে বাংলাদেশের পানির পক্ষ পাওয়ার জন্য যে যুক্তি, সেটার উপস্থাপনটা সহজ হয়। পাবে কিনা সেটা কিন্তু বলা যায় না। বাংলাদেশে আর্গুমেন্টটা তোলার রাস্তাটা একটু সহজ হলো পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে।''
তিনি বলেন, ''যেহেতু নয়াদিল্লিতে যেই দল পশ্চিমবঙ্গের সেই দল, ফলে নয়াদিল্লির সরকারকে রাজি করালে পশ্চিমবঙ্গের সরকারের সেটার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যুক্তি থাকে না। ফলে বাংলাদেশের জন্য এই নয়াদিল্লির সরকারকে রাজি করাতে পারলে—পানি পাওয়ার একটা রাস্তা হয়। কিন্তু ব্যাপারটা হয়তো এত সহজ হবে না, কারণ প্রদেশের একটা ইন্টারনাল পলিটিক্স আছে। পানিতে বাধা সরিয়ে নেবে, বিরোধী দলগুলো আবার চুপ করে বসে থাকবে, এমন তো হয় না। বিশেষ করে মমতা তো বিরোধী দলে আছেন। ওনাকে এই রাজনীতিটা বিজেপি করতে দিতে নাও পারে। এটা এখন বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কের গভীরতার ওপর নির্ভর করছে।''
সাবেক একজন রাষ্ট্রদূত বলেন, ''বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে জয়ী হলেও তিস্তা পানিচুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকবে। একইভাবে গঙ্গা পানিচুক্তির নবায়নের কী হবে, কতটুকু হবে—তা নিয়েও ধোঁয়াশা আছে। তবে গঙ্গা পানিচুক্তি প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক নিয়মেই ভারত থেকে বয়ে আসা নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা পাবে বাংলাদেশ।''



