সম্পূরক বাজেট নিয়ে সংসদে তর্কবিতর্ক, বিরোধীদের প্রশ্ন
সম্পূরক বাজেট নিয়ে সংসদে তর্কবিতর্ক

চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তর্কবিতর্ক হয়েছে। আজ সোমবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনা হয়।

বিরোধীদের আপত্তি

সরকারের ব্যয় প্রস্তাবের দাবির ওপর ভোট গ্রহণের সময় অর্থ বিভাগের দাবি নিয়ে আনা ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন দুর্বলতার কথা তুলে ধরে বিরোধী দল। অন্যদিকে সরকারি দলের সদস্যরা বলেন, কৃষি, আর্থিক খাত ও উন্নয়ন প্রকল্পে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিতেই অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থ বিভাগের জন্য ২৩ হাজার ৬৫৫ কোটি ৫৪ লাখ ৫ হাজার টাকার মঞ্জুরি দাবি উত্থাপন করেন। পরে বিরোধী সদস্যদের আনা ছাঁটাই প্রস্তাব নাকচ হওয়ার পর কণ্ঠভোটে দাবিটি গৃহীত হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রুমিন ফারহানার বক্তব্য

আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৬৮ লাখ কোটি টাকা হলেও প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৫ শতাংশ, খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ব্যাংক খাতে মূলধনের পর্যাপ্ততা ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে।

রুমিন ফারহানা বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২২ শতাংশ থেকে কমে ৫ শতাংশে নেমেছে। শ্বেতপত্রের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, এমন পরিস্থিতিতে সরকার কীভাবে ঘাটতি বাজেট বাস্তবায়ন করবে?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রুমিন ফারহানা বলেন, শেয়ারবাজার ও করব্যবস্থার সংস্কার না হলে পুরো চাপ গিয়ে পড়বে ব্যাংক খাতের ওপর। বাংলাদেশে ঘাটতি বাজেট পূরণে সাধারণত ব্যাংক ঋণ, বৈদেশিক ঋণ কিংবা অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাত বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত ঋণ দিতে পারবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

রুমিন ফারহানা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আগের ঋণচুক্তির পরবর্তী কিস্তি নতুন সরকারকে না দিয়ে নতুন করে চুক্তির কথা বলছে। ফলে ঋণের জন্য অন্য উৎসের দিকে তাকাতে হতে পারে। চীন বা অন্য কোনো দেশ থেকে ঋণ নিলে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) কিংবা আইএমএফের তুলনায় সুদের হার বেশি হয় এবং দ্রুত পরিশোধের চাপও থাকে। এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে বাজেট বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

শাহজাহান চৌধুরীর মতামত

চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, দীর্ঘ সময় পর একটি নতুন সরকার বাজেট দিয়েছে। পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা, রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না।

ঋণ কোথা থেকে আসবে?

আলোচনার শুরুতে ঢাকা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ব্যাংক খাত থেকে সরকারের প্রস্তাবিত ঋণ গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের আমানত ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ সংগ্রহ কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

সৈয়দ জয়নুল আবেদীন বলেন, অর্থমন্ত্রী যে বাজেট উপস্থাপন করেছেন, সেখানে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘এটা কীভাবে সম্ভব? এই টাকা কোথা থেকে আসবে?’

সৈয়দ জয়নুল আবেদীন আরও বলেন, একদিকে সরকার ৪০ হাজার কোটি টাকার পুনরুদ্ধার তহবিল বা ‘রেসকিউ ফান্ড’ গঠনের কথা বলছে, অন্যদিকে একই ব্যাংকিং খাত থেকে বিপুল ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এতে নীতিগত অসংগতি তৈরি হচ্ছে।

সরকারের ঋণ গ্রহণ বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন সৈয়দ জয়নুল আবেদীন। তাঁর ভাষ্য, সরকার যদি এত বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থের জোগান আরও সংকুচিত হতে পারে।

অতিরিক্ত বরাদ্দ আর্থিক শৃঙ্খলার ঘাটতি

কুষ্টিয়া-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আবদুল গফুর বলেন, নির্ধারিত বরাদ্দের মধ্যে ব্যয় সীমাবদ্ধ রাখতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এই অতিরিক্ত চাহিদা প্রমাণ করে সরকারি ব্যয়ে যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ও মিতব্যয়িতা ছিল না।

মো. আবদুল গফুর বলেন, অর্থবছরের শুরু থেকেই ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা থাকলে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন অনেকাংশে এড়ানো যেত।

অর্থমন্ত্রীর জবাব

জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্যই অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রয়োজন হয়েছে। তিনি জানান, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের আসল ও সুদ মওকুফ এবং এডিপিভুক্ত দুটি ও এডিপিবহির্ভূত চারটি প্রকল্পে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগান দিতে বাড়তি বরাদ্দের প্রয়োজন হয়েছে।

তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নিজস্ব ব্যয় মেটাতে কোনো অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব কারণে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রস্তাব যৌক্তিক। ফলে সংসদ সদস্যদের আনা ছাঁটাই প্রস্তাব গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

পরে বিরোধী সদস্যদের আনা ছাঁটাই প্রস্তাব নাকচ হওয়ার পর কণ্ঠভোটে অর্থ বিভাগের মঞ্জুরি দাবি গৃহীত হয়।