জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট মূলত সবাইকে খুশি করার জন্য জনতুষ্টিমূলক একটি বাজেট। এ বাজেটে যে যা চেয়েছে, তা-ই দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে এবং জনগণকে এক ধরনের স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এই বিপুল পরিমাণ অর্থের সংকুলান কোথা থেকে হবে, সেটি খোদ বাজেট প্রণেতারাও নিজেরা হয়তো বলতে পারবেন না।
সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে জাতীয় পার্টি এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
গণতান্ত্রিক বাজেটের দাবি নিয়ে প্রশ্ন
জিএম কাদের বলেন, অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় এবারের বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অগ্রযাত্রা’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তবে এটি কীভাবে একটি ‘গণতান্ত্রিক বাজেট’ হলো, তা আমার কাছে পরিষ্কার নয়। মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অংশ হিসেবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ব্যাপকভাবে সামাজিক নিরাপত্তা জালের আওতায় আনার যে প্রস্তাব করা হয়েছে এবং সব শ্রেণির মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণের যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা মূলত একটি প্রথাগত পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি মাত্র। গতানুগতিকভাবে পূর্বের অর্থবছরের তুলনায় একটি নির্দিষ্ট হারে বৃদ্ধি করে পুরনো পদ্ধতিতেই এ নতুন অর্থবছরের বাজেট তৈরি ও উপস্থাপন করা হয়েছে।
রাজস্ব আহরণ ও ঋণনির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ
নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে অনেক পণ্যের আমদানি শুল্কে রেয়াত দেওয়া এবং জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে নানা খাতের বরাদ্দকে স্বাগত জানিয়ে জাপা চেয়ারম্যান বলেন, সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা থাকলেও বাজেট বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যে আয়ের ক্ষেত্র দেখানো হয়েছে, তা অত্যন্ত অনিশ্চিত। প্রস্তাবিত বাজেটে যে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ দেশে বর্তমানে কোনো ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নেই। কলকারখানা প্রতিনিয়ত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে; ইতোমধ্যে প্রায় ৪০০-এর মতো কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে দেশে বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, বাজেটে তার কোনো প্রতিফলন বা দূরদর্শিতা দেখা যায়নি।
দেশের আইনশৃঙ্খলা ও ব্যবসায়ের পরিবেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সাবেক এ মন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। রাত ১০টার পর মানুষ রাস্তা দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে পারছে না। সাধারণ মানুষ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিকতায়।
বাজেটের গাণিতিক বিশ্লেষণ
বাজেটের গাণিতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরে জিএম কাদের জানান, প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাক্কলিত পরিচালন ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এ খরচ কমানোর কোনো সুযোগ নেই, বরং তা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ পরিচালন ব্যয়ের বিপরীতে সম্পূর্ণ রাজস্ব আহরণ ব্যবহার করার পরেও আরও অতিরিক্ত ২ লাখ ২৯ হাজার ৬১১ কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে। অর্থাৎ সরকারকে শুধুমাত্র পরিচালনা ব্যয়ের ঘাটতি পূরণ করতেই দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। এর পাশাপাশি উন্নয়ন ব্যয়ের বরাদ্দের জন্য পূর্বে প্রস্তাবিত বাজেটে উল্লিখিত বৈদেশিক ঋণসহ আরও ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে। ফলশ্রুতিতে মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। এ বিশাল ঘাটতি দেশি ও বিদেশি ঋণের মাধ্যমে পূরণ করতে হবে বিধায়, এ অতিরিক্ত ঋণনির্ভর বাজেটকে কোনো বিচারেই বাস্তবায়নযোগ্য বলা যায় না।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তা
জিএম কাদের বলেন, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে দেশের আর্থ-সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য বাজেটে বর্ণিত আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির উন্নয়ন প্রয়োজন, আর এর জন্য এ মুহূর্তে জরুরি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আওয়ামী লীগের মতো বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে তাদের সমর্থক বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার বহাল না করলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অর্থাৎ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত না করা হয়, তবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে এ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে মনে করেন তিনি।
জিএম কাদের বলেন, দেশ একটি সংকট কাল অতিক্রম করছে। সংকটের মাত্রা এবং গভীরতা এখন পর্যন্ত ধারণা করা যাচ্ছে না। সেই প্রেক্ষিতে জাতীয় ঐক্য গড়তে প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ভুলে দল মত নির্বিশেষে সকল নাগরিককে একতাবদ্ধ করতে হবে।
এ সময় সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন দলের মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী, প্রেসিডিয়াম সদস্য সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলনসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরে দেশীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থানমুখী বাজেট প্রণয়নের দাবি জানান।



