জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে কোনও ধরনের ‘ফ্রেন্ডলি গেম’ চলছে না বলে মন্তব্য করেছেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, সংসদে সরকার ও বিরোধী দল নিজ নিজ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছে এবং বিষয়টি কোনও প্রতিযোগিতা বা খেলাধুলার মতো নয়।
বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে চিফ হুইপের বক্তব্য
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) জাতীয় সংসদের এলডি হলে বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। বাজেট বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের বক্তব্য এবং ঐক্যমত্যের বিষয়ে সাংবাদিকদের ‘মেসি-রোনালদোর ফ্রেন্ডলি ম্যাচ’ প্রসঙ্গ টেনে করা প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, “বাংলাদেশের পার্লামেন্টে পজিশনে তারেক রহমান আর অপজিশনে ডা. শফিকুর রহমান এখানে এ ধরণের কোনও গেম নাই। কেউ যদি এটি বলে থাকেন তবে সেটি তার ব্যক্তিগত অভিমত। দেশের মানুষ যেভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকতে চায়, সেভাবেই সরকারি ও বিরোধী দল মিলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাক-এটিই সরকারের চাওয়া।”
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি আরও বলেন, রোনালদো ও মেসি ফুটবল খেলেন। কিন্তু বাংলাদেশের সংসদে কোনও খেলা চলছে না। এখানে সরকার ও বিরোধী দল নিজ নিজ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছে। কেউ যদি এটিকে ‘ফ্রেন্ডলি গেম’ বলে থাকেন, সেটি তার ব্যক্তিগত মতামত।
সরকার ও বিরোধী দলের গঠনমূলক সহযোগিতার আহ্বান
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই, দেশের স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দল গঠনমূলকভাবে একসঙ্গে কাজ করুক। বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু বিরোধিতা করা নয়, যৌক্তিক বিষয়ে সমর্থন দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে সরকারের সমালোচনা করাও তাদের দায়িত্ব। বিরোধী দল যদি কোনও যৌক্তিক সমালোচনা করে, আমরা তা গ্রহণ করবো। আবার তারা যদি দেশের স্বার্থে সহযোগিতা করে, সেটিকেও স্বাগত জানাবো।”
তিনি বলেন, “আজ যারা বিরোধী দলে আছেন, ভবিষ্যতে তারা সরকারে যেতে পারেন, আবার আমরা বিরোধী দলে যেতে পারি। তাই একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখাই আমাদের লক্ষ্য।”
সংবিধান সংশোধন: সংসদে সংস্কার আলোচনা বাইরে
সংবিধান সংশোধন বিষয়ে চিফ হুইপ বলেন, সংবিধান সংশোধন হবে সংসদে আর সংস্কার আলোচনা হবে সংসদের বাইরে। জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার ও উচ্চকক্ষ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুলাই সনদের অনেক বিষয় বর্তমান সংবিধানের সঙ্গেই সম্পর্কিত। সংবিধানে ১৫৩টি অনুচ্ছেদ রয়েছে, আর জুলাই সনদে প্রায় ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। তাই শুধু ওই ৩০টি বিষয়কে আলাদা করে বাস্তবায়ন করলে হবে না, পুরো সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে।
তিনি জানান, “আমাদের সামনে তিনটি পথ রয়েছে—নতুন সংবিধান প্রণয়ন, সংবিধান স্থগিত রেখে নতুন ব্যবস্থা চালু করা, অথবা বিদ্যমান সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার করা। আমরা তৃতীয় পথেই এগোচ্ছি, অর্থাৎ সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে চাই।”
চিফ হুইপ বলেন, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মূল উদ্দেশ্যের কোনও বড় পার্থক্য আমি দেখি না। প্রধানমন্ত্রীও তার সমাপনী বক্তব্যে বলেছেন, সংস্কার-সংক্রান্ত আলোচনা সংসদের বাইরে সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে চলবে, আর সংসদের ভেতরে সংবিধান সংশোধনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগোবে। সংবিধান সংশোধনের কাজ সময়সাপেক্ষ। এটি দেশের সর্বোচ্চ আইন, তাই সব দিক বিবেচনা করে ধীরে-সুস্থে এগোতে হবে।
১০ বিলিয়ন ডলার পাচার ও হামে শিশু মৃত্যুর তদন্ত
হামে শিশু মৃত্যুর বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইতোমধ্যে এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তার তথ্য অনুযায়ী, আগের দুই বছরে দেশে পর্যাপ্ত হামের টিকা আনা হয়নি। ফলে টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং বর্তমানে হামের প্রকোপ বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, “শিশুমৃত্যুর বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এটি এমন কোনও বিষয় নয়, যা অবহেলা করা যায়। প্রধানমন্ত্রী নিজেও ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি তদারকি করছেন। তার উদ্যোগে দ্রুত টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত টিকা রয়েছে এবং সারাদেশে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তবে যেসব শিশু ইতোমধ্যে সংক্রমিত হয়েছে বা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল, তাদের ক্ষেত্রে সেই প্রভাব এখন প্রকাশ পাচ্ছে। আমরা আশা করছি, চলমান টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসবে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতির উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, “আপনারা জানেন, এটা মানুষও বলাবলি করে লাস্ট গভর্নমেন্টের সময় ভয়াবহ দুর্নীতি হয়েছে। প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের মতো দুর্নীতি হয়েছে। সেটা দুর্নীতির আওতায় আনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন বা অন্যান্য মন্ত্রীও বলেছেন বা সদস্যরা বলেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনকে আমি বলতে চাই- যে কোনও অপরাধই অপরাধ, মানে ছেড়ে দেওয়ার মতো না। শিশু মৃত্যুর ব্যাপারটা আমরা সিরিয়াসলি নিয়েছি।”



