ফরহাদ মজহারের তীব্র অভিযোগ: জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নস্যাৎ, নির্বাচন সাংবিধানিক নয়
কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার অভিযোগ করেছেন যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে নস্যাৎ করে জনগণ ও তরুণদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে এই প্রক্রিয়ারই ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, এই নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে বৈধ হয়নি।
বৃহস্পতিবার বইমেলার অনুষ্ঠানে বক্তব্য
বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অমর একুশে বইমেলার মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ফরহাদ মজহার এ কথা বলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ম্যাগাজিন ‘গণগ্রাফিতি’–এর মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে এই আয়োজন করা হয়, যার নামটি ফরহাদ মজহারের দেওয়া।
লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণির ক্ষমতায় থাকার অভিযোগ
ফরহাদ মজহার বলেন, ‘যারা এস আলম, বসুন্ধরা গ্রুপসহ লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণির সঙ্গে ছিল, যারা কোটি কোটি বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে পাচার করেছে, তারা এখন বাংলাদেশে ক্ষমতায় আছে। এটাকে গণতন্ত্র বলে না।’ তিনি ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে ইঙ্গিত করে যোগ করেন, ‘যে দল নিজের নেতৃত্ব নির্বাচন করে না, নিজে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, সে কিন্তু দেশের ক্ষমতায়। এটা অদ্ভুত ব্যাপার। এই প্রহসনগুলো আমাদের মনে রাখতে হবে।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনা ও মার্কিন হস্তক্ষেপ
তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপে একটি রেজিম চেঞ্জ বা শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তন হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। ফরহাদ মজহার বলেন, ‘সেই ঘটনায় দুর্ভাগ্যক্রমে তরুণেরাও অংশগ্রহণ করেছে। তারই করুণ পরিণতি আমরা দেখছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই সরকারের অধীনে যে নির্বাচন হয়েছে, এটাও কিন্তু অবৈধ। যে নির্বাচন হয়েছে, এটা সাংবিধানিক হয়নি।’
বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্য ও রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া
বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করতে না পারার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যের কথা উল্লেখ করে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘বাংলাদেশে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী বলে যারা আছে, এরা গরু, ছাগল ও ভেড়া।’ তিনি রাষ্ট্র গঠন এবং সরকার গঠনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরে বলেন, ‘রাষ্ট্র গঠন হলো একধরনের রাজনীতি; আর রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করা অন্য বিষয়। আমরা রাষ্ট্রই গঠন করতে পারিনি।’
আশা হারানোর নেই, ভবিষ্যতে বড় রূপান্তরের ইঙ্গিত
ফরহাদ মজহার বলেন, ‘দেশের জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে গণ-অভ্যুত্থানকে নস্যাৎ করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের আশা হারানোর কোনো যুক্তি নেই। আমাদের পড়তে হবে, বুঝতে হবে কোথায় ভুল করেছি। তরুণদের প্রথম কাজ হবে জনগণের আস্থা আবার ফিরিয়ে আনা।’ তিনি আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে আরেকটি ‘বড় রূপান্তর’ ঘটবে বলে মনে করেন এবং বলেন, ‘এই রূপান্তরটা ঘটবেই। এটা শুধু বাংলাদেশে ঘটবে, তা আমি মনে করি না। এটা উপমহাদেশেও ঘটতে পারে, পৃথিবীব্যাপীও ঘটতে পারে।’
‘গণগ্রাফিতি’ ম্যাগাজিন ও অনুষ্ঠানের অন্যান্য বক্তা
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ম্যাগাজিন ‘গণগ্রাফিতি’তে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, সংস্কার ও নির্বাচন বিষয়ে শহীদ পরিবার, তিনটি রাজনৈতিক দল (বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি), বিভিন্ন পক্ষ ও গোষ্ঠীর চিন্তা স্থান পেয়েছে। ম্যাগাজিনটি সম্পাদনা করছেন সংগঠনের দপ্তর সেল সম্পাদক শাহাদাত হোসেন। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে প্রাসঙ্গিক রাখা এবং এর অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষাগুলোকে জাগিয়ে রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম এই অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। সভাপতিত্ব করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব সালেহউদ্দিন সিফাত, কবি ও গবেষক ইমরান মাহফুজ, লেখক ও অ্যাকটিভিস্ট মোহাম্মদ সজল প্রমুখ।
