রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ঐতিহাসিক ভাষণে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশের সূচনা
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন, হাজারো শহীদের রক্তের ওপর দিয়ে তাঁবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, সবার সম্মিলিত আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে। কোটা সংস্কার আন্দোলন এক পর্যায়ে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। দেশের ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, প্রবাসী তথা সকল শ্রেণি পেশার মানুষ, গণতন্ত্রের পক্ষের রাজনৈতিক দলসহ সবার সম্মিলিত আন্দোলনের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে।
তিনি আরও বলেন, আমি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের এবং দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম, খুন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্যদের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি।
দুর্নীতি দমন ও ঐতিহাসিক অর্জন
রাষ্ট্রপতি বলেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে ২০০১ সালের জুনে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছিল। ২০০১ সালের অক্টোবরে পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের দায়িত্ব নিয়ে, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার দুর্নীতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ প্রণয়ন করে। এর ফলে বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে বাংলাদেশ মুক্তি পায়।
তিনি আরও বলেন, ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপি যখন রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়, তার অনেক আগেই বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের কলঙ্ক থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ এশিয়ার ইমার্জিং টাইগার হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এবারও দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই হবে বর্তমান সরকারের প্রথম এবং প্রধান অগ্রাধিকার।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই উদ্বোধনী অধিবেশন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এই মহান জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল ও এই নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন।
তিনি বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন, মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিরলস পরিশ্রম, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তির আন্তরিক উদ্যোগ এবং সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
বিএনপির বিপুল বিজয় ও অভিনন্দন
রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমান সংসদে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। তিনি এই সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তিনি এই মহান জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সব সংসদ সদস্যকেও অভিনন্দন জানান।
মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও নেতাদের স্মরণ
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সব অবিসংবাদিত নেতার অবদানকেও তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, আমি, তিনবারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি, যিনি দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে প্রতিবার সামনের কাতারে থেকে আপসহীন নেতৃত্ব দিয়েছেন।
বিরোধী দলের প্রতিবাদ ও অধিবেশনের ঘটনা
এর আগে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ভাষণ দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন। এ সময় বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। তাদের হাতে বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। প্ল্যাকার্ডে জুলাই নিয়ে গাদ্দারি চলবে না, জুলাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যতা বন্ধ করসহ বিভিন্ন স্লোগান লেখা রয়েছে। স্পিকার এ সময় সবাইকে শান্ত থাকতে আহ্বান জানান। তবে শেষ পর্যন্ত অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলের সদস্যরা।
