সংসদ অধিবেশনে উত্তেজনা: বিরোধী দলের তীব্র প্রতিবাদ ও ওয়াকআউট
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ ঘিরে সংসদে সাময়িক কিন্তু তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বিরোধী দলীয় সদস্যরা রাষ্ট্রপতির ভাষণ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে জোরালো বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন, যা শেষ পর্যন্ত ওয়াকআউটে রূপ নেয়। এই ঘটনায় সংসদীয় কার্যক্রম অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে এবং রাজনৈতিক বিভাজনের ছবি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
বিক্ষোভের সূচনা ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ দানের জন্য সংসদে আমন্ত্রণ জানালে, বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাহিদ ইসলাম স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন কিছু বলার জন্য। স্পিকার মাইক না দিলে, নাহিদ ইসলাম দাঁড়িয়ে ‘কিলার ইন দা পার্লামেন্ট!’ বলে উচ্চারণ করেন এবং ‘নো, নো’ বলে প্রতিবাদ জানান। এই মুহূর্ত থেকেই বিরোধী দলীয় সব সদস্য একযোগে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন বক্তব্য ও তৈরি প্ল্যাকার্ড হাতে ধরে প্রতিবাদ করতে শুরু করেন। উল্লেখ্য, এই সময়ে বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে শুধুমাত্র জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান তাঁর আসনে বসে ছিলেন, যা একটি ব্যতিক্রমী দৃশ্য তৈরি করে।
স্লোগান ও উত্তেজনার বিস্তার
স্পিকার বিরোধীদলীয় সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানালেও, তাঁরা বিক্ষোভ চালিয়ে যান। একপর্যায়ে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ‘কিলার চুপ্পু, বয়কট চুপ্পু’ বলে স্লোগান দেন, যা সংসদ কক্ষে আরও উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এই হইচইয়ের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি সংসদে প্রবেশ করে স্পিকারের আসনের পাশে আসেন এবং স্পিকার তাঁকে চেয়ারে বসার অনুরোধ জানান। তখনো বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল, কিন্তু স্পিকার রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ দেওয়ার অনুরোধ করেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও বিরোধী দলের তীব্র প্রতিক্রিয়া
রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিতে দাঁড়ালে, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনি রাষ্ট্রের অভিভাবক ছিলেন। কিন্তু আপনি সেই অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। আপনি ফ্যাসিবাদের দোসরের ভূমিকা পালন করেছেন।’ অন্য সংসদ সদস্যরা ‘গেট আউট, গেট আউট’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। কিছু সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকার পর, বিরোধী দলের সদস্যরা নিম্নলিখিত স্লোগানগুলো দেন:
- ফ্যাসিবাদের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান
- স্বৈরাচারের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান
- ফ্যাসিবাদ আর গণতন্ত্র, একসাথে চলে না
এর মধ্যেই রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণ শুরু করেন, এবং বিরোধী দলের সদস্যরা সরকারি দলের সদস্যদের দিকে তাকিয়ে ‘লজ্জা লজ্জা’ বলে বিদ্রূপ করেন। স্পিকার বারবার সংসদীয় শৃঙ্খলা রক্ষার আহ্বান জানালেও, বিরোধীদলীয় সদস্যরা বিক্ষোভ চালিয়ে যান।
ওয়াকআউট ও অধিবেশনের পরিণতি
শেষে, বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের ‘ওয়াকআউট’ করার ঘোষণা দিয়ে বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ভাষণ চালিয়ে যান এবং বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তাঁর ভাষণ শেষ হয়। এর পরপরই স্পিকার অধিবেশন ১৫ মার্চ পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিরোধীদলীয় সদস্যরা আর সংসদ অধিবেশনে যোগ দেননি, যা রাজনৈতিক সংঘাতের একটি নতুন মাত্রা যোগ করে।
এই ঘটনাটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্যক্রমের শুরুতে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে বিরোধী দল তাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানাতে সংসদীয় পদ্ধতির বাইরে গিয়ে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেছে।
