নতুন সরকারের মব কালচার: বিএনপির ইশতেহার বনাম বাংলাদেশ ব্যাংকের বাস্তবতা
বিএনপি সরকারের মব কালচার: ইশতেহার বনাম বাস্তবতা

নতুন সরকারের মব কালচার: বিএনপির ইশতেহার বনাম বাংলাদেশ ব্যাংকের বাস্তবতা

রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে বিভিন্ন পদে বদল আসা অস্বাভাবিক নয়। কারণ, প্রতিটি সরকারের নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও কর্মসূচি থাকে, যা বাস্তবায়নের জন্য তারা নিজেদের পছন্দমতো ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়। বিএনপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘সর্বস্তরে আইনের শাসন বাস্তবায়ন’ এর অঙ্গীকার রয়েছে। ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বিএনপি আইনের শাসন বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী।’

নেতাদের বক্তব্য ও আশার আলো

১৮ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে প্রথম কর্মদিবসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন, ‘মব কালচার শেষ।’ একইভাবে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে বলেন, ‘দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি নয়; আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।’ এই বক্তব্যগুলো মানুষকে আশান্বিত করেছিল, এবং বহু মানুষ বিশ্বাস করেছিল যে বিশৃঙ্খলার কালের অবসান হবে।

বাস্তবতা: বাংলাদেশ ব্যাংকে মবের ঘটনা

কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৯ দিন পরই বাংলাদেশ ব্যাংকে মবের ঘটনা ঘটে, যা রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। এই ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে সরকারের অঙ্গীকারের সত্যতা নিয়ে। গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, যিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে কাজ করা সুপরিচিত অর্থনীতিবিদ, তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। মনসুর ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট গভর্নর পদে নিয়োগ পান এবং তাঁর ১৮ মাসের মেয়াদে বেশ কিছু সফলতা অর্জন করেন:

  • ডলার সংকট কাটিয়ে মুদ্রার দাম স্থিতিশীল করা।
  • বৈদেশিক মুদ্রার মজুত স্বস্তিজনক অবস্থায় নিয়ে আসা, যা এখন পাঁচ থেকে ছয় মাসের আমদানির সমপরিমাণ।
  • খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উন্মোচন ও আন্তর্জাতিক মানে সংজ্ঞা উন্নীত করা।
  • ইসলামি ব্যাংক একীভূতকরণ এবং অনিয়ম দূর করার উদ্যোগ।

তাঁর শক্ত ব্যবস্থা নেওয়ায় অনেকেই তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন, এবং সরকার তাঁকে সম্মানজনকভাবে বিদায় না দিয়ে মবের মাধ্যমে অপসারণের পথ বেছে নেয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের মব সংস্কৃতি

বিগত ১৮ মাসে বাংলাদেশে বহু মবের ঘটনা ঘটেছে, যা ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়’ প্রবাদের মতো বর্তমান বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নানা বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়:

  1. সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের পদত্যাগ করানো।
  2. সচিবালয়ে শিক্ষার্থীদের ঢুকে পড়া ও ‘অটোপাস’ দেওয়ায় বাধ্য করা।
  3. ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংস।
  4. জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, এই সময়ে মব সন্ত্রাসে ২৯৩ জন নিহত হন, এবং সংবাদমাধ্যম যেমন প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারে হামলা চালানো হয়।

মানুষের প্রত্যাশা ও সরকারের ভবিষ্যৎ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে পারলেও বিশৃঙ্খলা দূর করতে ব্যর্থ হয়েছে। নতুন বিএনপি সরকারের কাছে এখন চ্যালেঞ্জ হলো তাদের ইশতেহারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনা পরে, মানুষ অপেক্ষায় আছে কখন সরকার আইনি ব্যবস্থা নেবে এবং ‘মব কালচার শেষ’ ঘোষণা কেবল কথার কথা না হয়ে উঠবে। ১৮৩৮ সালে আব্রাহাম লিংকন যেমন বলেছিলেন, কোনো অভিযোগের প্রতিকার মবের মাধ্যমে যুক্তিযুক্ত নয়, বরং আইনের শাসনই সমাধান। ২০২৬ সালে বিএনপি সরকারকেও এই নীতিতে অটল থাকতে হবে, যাতে গণতন্ত্র ও শান্তি বজায় থাকে।