বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. মঈন খান বলেছেন, বর্তমান সংসদ এখনই গণতন্ত্রের মাইলফলক হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় এখনও আসেনি। সংসদের সফলতা নির্ভর করবে এর কার্যকারিতা, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর। তিনি বলেন, সংসদের আলোচনাগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে এই সংসদ ভবিষ্যতে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য
বুধবার (১৩ মে) বিকেল তিনটায় রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ‘গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বর্তমান সংসদ একটি নতুন মাইলফলক কিনা’ শীর্ষক সিটিজেন ফোরাম, বাংলাদেশ গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। ড. মঈন খান বলেন, তিনি নিজেকে কোনো বিশেষ ব্যক্তি নয়, বরং বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেই দেখেন। সংসদের আলোচনা থেকে তিনি নতুনভাবে অনেক কিছু শিখছেন বলেও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পাঁচবার সংসদ সদস্য হওয়াটা বড় পরিচয় নয়; বর্তমান যুগে মানুষ গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সেমিনারে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করছে। তাই বর্তমান সংসদ ভবিষ্যতে মাইলফলক হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে যারা জীবন দিয়েছিলেন, তারা একদলীয় ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের ‘জগদ্দল পাথর’ সরিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন সামনে এনেছিলেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন সংসদের ওপর। রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ—নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও সংসদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংসদের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন। কিন্তু বাস্তবে সংসদ সদস্যরা কতটুকু সেই দায়িত্ব পালন করছেন, সেটি বড় প্রশ্ন।
তিনি জানান, ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং ১১০টি আইন পাস হয়েছে, কিন্তু তিনি নিজেও সব আইন পড়ে পাস করেননি। তাই সংসদ সদস্যদের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। ড. মঈন খান বলেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সংসদ সদস্যদের শুধু আইন প্রণয়ন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। রাত তিনটায়ও অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিতে সাহায্যের জন্য এমপিদের ফোন আসে। ‘জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ’—সব ধরনের কাজই তাদের করতে হয়। নতুন সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মানুষের সমস্যা এড়িয়ে গেলে জনগণ তা মেনে নেবে না।
এমপিদের চ্যালেঞ্জ
এমপিদের জন্য এলাকায় অফিস বরাদ্দ নিয়ে সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, জনগণ ভোটের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব দিয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, অনেক সময় তার নিজের কাছেই মনে হয় তিনি যেন ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হয়ে বসে আছেন। সত্য কথা বললে সরকার ও বিরোধী—দুই দিক থেকেই চাপ আসে, ফলে সংসদ সদস্যদের অবস্থা ‘শাঁখের করাতের’ মতো হয়ে যায়। তিনি বলেন, এই কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই সংসদকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। গণতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণতন্ত্র রক্ষা করতে হলে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। একইসঙ্গে তিনি ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন, তবে সংখ্যালঘুর সম্মতির ভিত্তিতে’ গণতন্ত্র পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ড. মঈন খান আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়কে তিনি ‘ডকট্রিন অফ নেসেসিটি’ হিসেবে দেখেন। এখন দেশের প্রধান দায়িত্ব শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ২৫০ বছরের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই আমেরিকার গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশের ৫০ বছরের বেশি সময়েও কতটা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়া গেছে, সেটি বড় প্রশ্ন। বর্তমান সংসদ যদি ভবিষ্যতের জন্য শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়তে পারে, তাহলেই এটি সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।
সভাপতির বক্তব্য
সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, আজকের আলোচনা থেকে তিনি সমৃদ্ধ হয়েছেন এবং আলোচনাগুলো অত্যন্ত সময়োপযোগী। তিনি অনুরোধ করেন, এখানে যেসব বক্তব্য ও আলোচনা হয়েছে, সেগুলো লিখিত আকারে গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হোক। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বলা ঠিক নয়, কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা একবারই এসেছে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে। এটিকে তিনি প্রচলিত অর্থে বিপ্লবও বলতে চান না; কারণ ফরাসি, রুশ বা চীনা বিপ্লবের মতো সশস্ত্র শ্রেণিভিত্তিক বিপ্লব এটি ছিল না। তবে ছাত্র-তরুণদের নেতৃত্বে প্রায় ১৪শ শহীদের রক্তের বিনিময়ে সংঘটিত সফল গণঅভ্যুত্থান হিসেবে তিনি একে অভিহিত করেন এবং শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
তিনি বলেন, এটিকে তিনি ‘রেনেসাঁ’ বা পুনর্জাগরণ বলতে চান। ইউরোপের রেনেসাঁ যেমন মানুষের জাগরণ ও মুক্তির সূচনা করেছিল, তেমনি দীর্ঘ ১৭ বছরের দুঃশাসন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষের জাগরণ থেকেই এই গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে। ইউরোপে রেনেসাঁ ও রিফর্মেশন আন্দোলনের মাধ্যমে যেমন সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তন এসেছিল এবং সামন্তবাদী অর্থনীতি পুঁজিবাদে রূপ নিয়েছিল, তেমনি বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া গণতন্ত্র সফল হবে না বলে তিনি মত দেন।
তিনি বলেন, দেশের সমাজ এখনও বৈষম্য, শোষণ ও বঞ্চনায় বিভক্ত; ভূমিহীন, প্রান্তিক কৃষক ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, শ্রমিকের মজুরি কমছে। তাই এই বাস্তবতায় গণতন্ত্রের চর্চা কঠিন। সংসদকে এখনই ‘মাইলফলক’ বলা যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি অধিবেশনের ভিত্তিতে সংসদের মূল্যায়ন সম্ভব নয়। বহু অধিবেশন শেষে বোঝা যাবে সংসদ কতটা কার্যকর বা সফল হয়েছে। তবে তিনি সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে সৌহার্দ্য, আন্তরিকতা ও সহযোগিতার মনোভাব দেখে আশাবাদী হওয়ার কথা জানান। সংসদ নেতা, বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য এবং এনসিপির নেতা নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে বড় ধরনের বিরোধ তিনি দেখেননি। বিভিন্ন সংসদীয় কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী দলের সমান প্রতিনিধিত্বকেও তিনি ইতিবাচক সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেন।
অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ ও ঐক্যই দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শক্তি। বিভক্তি, দোষারোপ ও প্রোপাগান্ডার রাজনীতি গণতন্ত্রের পথকে আরও কঠিন করে তুলবে। তাই সহিষ্ণুতা ও জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে গণতন্ত্রের বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে হবে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠন জরুরি। জ্ঞানবিমুখ সমাজে গণতন্ত্র সফল হতে পারে না। এজন্য দেশে কার্যকর শিক্ষানীতি প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, অতীতের শিক্ষা কমিশনগুলোর ইতিবাচক সুপারিশও বাস্তবায়িত হয়নি। গ্রামের মেধাবী রাখাল বালকেরাও যেন সুযোগ পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে, সেই বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের বক্তব্য
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল এহসান জোবায়ের বলেন, সংসদ নিয়ে এখনই চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় না এলেও শুরুটা ভালো হয়েছে। তিনি বলেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংসদ প্রকৃত অর্থে জনগণের পার্লামেন্ট ছিল না; সেই তুলনায় ২০২৬ সালের সংসদ জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জায়গা তৈরি করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, সংসদের প্রায় ৭০ থেকে ৭৪ শতাংশ সদস্য নতুন এবং প্রথমবার নির্বাচিত হলেও বড় অংশই কোটিপতি ও ব্যবসায়ী। এতে আশঙ্কা রয়েছে যে অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থে সংসদ ব্যবহার করতে পারেন। তিনি আরও বলেন, প্রায় ২০০ ঋণখেলাপিকে বিশেষভাবে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা উদ্বেগের বিষয়।
এহসান জোবায়ের জানান, জাতীয় সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে দীর্ঘ আলোচনা ও গণভোটের মধ্য দিয়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ পাস হয়েছিল এবং জনগণের প্রায় ৭০ শতাংশ এতে সমর্থন দিয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল সংসদ প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে এটি আলোচনায় আনবে এবং ১৮০ দিনের মধ্যে পাস করবে। তিনি দাবি করেন, গণভোটের প্রস্তাব প্রথমে জামায়াতই দিয়েছিল; পরে বিএনপি এতে সম্মত হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গণভোট না হওয়াকে তিনি দুঃখজনক বলেন। সংসদের প্রতি প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সংসদ যেন আবার স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের দিকে না যায়। নারী প্রতিনিধিত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নারীদের জন্য নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াত আমির ড. শফিকুর রহমানের আইডি হ্যাকের ঘটনায় কিছু নারী নেত্রী সরব হলেও নারীদের ওপর বাস্তব হামলা-নির্যাতনের বিষয়ে তারা নীরব ছিলেন। রাজনৈতিক পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে সবার পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদ, রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজ—সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে একটি সুন্দর, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
যুগান্তর সম্পাদকের বক্তব্য
অন্যদিকে দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক আব্দুল হাই শিকদার বলেন, তিনি অনুষ্ঠানে মূলত শ্রোতা হিসেবে এসেছিলেন। তিনি টকশো সংস্কৃতির অতিরিক্ত বাকবিতণ্ডার সমালোচনা করে বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরলভাবে সরকার পরিবর্তনের পর বহু বুদ্ধিজীবী দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, যা সমাজের গভীর অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে। তবে তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিন পর দেশে একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়েছে এবং সেটিই বড় ইতিবাচক দিক। তিনি বলেন, অতীতের সংসদকে ‘শূকরের খোঁয়াড়’ বলা হলেও বর্তমান সংসদে কিছু পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি ও বিরোধী দলের নেতাদের দায়িত্বশীল বক্তব্য তাকে আশাবাদী করেছে। তবে কিছু এমপির আচরণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ডিসিকে ফুল দিয়ে বরণ করার মতো ঘটনা সংসদ সদস্যদের অবস্থান সম্পর্কে দুর্বল ধারণার পরিচয় দেয়। অতিরিক্ত তোষামোদ ও বিশেষণ ব্যবহারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এসব সংস্কৃতি সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আব্দুল হাই শিকদার বলেন, এখনই সংসদকে ‘মাইলফলক’ বলা তাড়াহুড়ো হবে; আরও সময় দিতে হবে। তবে বহু স্বপ্নভঙ্গ ও ফ্যাসিবাদের অভিজ্ঞতার পর দেশের মানুষের মধ্যে নতুন করে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। সেই জাগরণের প্রবাহ যেন কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিই সবার প্রত্যাশা হওয়া উচিত।
সুজন সম্পাদকের বক্তব্য
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে পাঁচটি নির্বাচনে—১৯৭৩, ২০০১, ২০০৮, ২০১৮ ও ২০২৬ সালে—দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠিত হয়েছে। কিন্তু আগের চারবারই শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর হয়নি, যা একটি অশনি সংকেত। তাই এবার যেন সেই ব্যর্থতা না ঘটে। তিনি বলেন, সংসদকে এখনই ‘মাইলফলক’ বলা যাবে না; এর সফলতা নির্ভর করবে সদস্যদের যোগ্যতা, মানসিকতা, ম্যান্ডেট ও কার্যক্রমের ওপর। পাশাপাশি তারা অলিগার্ক বা প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠী দ্বারা প্রভাবিত কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ড. বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, সংসদ সদস্যরা একইসঙ্গে আইনপ্রণেতা ও সংস্কার পরিষদের ম্যান্ডেট পেয়েছেন, তবে বর্তমান পরিস্থিতি একটি ‘সুপ্রা-কনস্টিটিউশনাল’ বাস্তবতা। সংসদকে সার্বভৌম বলা ঠিক নয়, কারণ সংবিধান ও আদালতের রায় দ্বারা এর সীমা নির্ধারিত। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও ভূমি-সংক্রান্ত সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও যথাযথভাবে এগোয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এমপিদের ‘স্থানীয় এমপি রাজ’ ও অবৈধ প্রভাব থেকে দূরে রাখতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে এমপিদের বসার জায়গা দেওয়ার প্রজ্ঞাপনকে তিনি সংবিধানবিরোধী বলে উল্লেখ করেন। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্থানীয় সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচিত স্থানীয় প্রতিনিধিদের, এমপিদের নয়; আর ৬৫ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। আদালতের রায়েও এমপিদের স্থানীয় উন্নয়নে সরাসরি সম্পৃক্ততাকে অসাংবিধানিক বলা হয়েছে। ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণতন্ত্র শুধু আইন প্রণয়নের বিষয় নয়, এটি একটি মানসিকতা। তাই স্বার্থের দ্বন্দ্ব নিয়ন্ত্রণে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ আইন জরুরি। দলীয় বিভাজন নয়, বরং সমন্বয় ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে গণতন্ত্র রক্ষা করতে হবে, যাতে অতীতের ব্যর্থতা আর ফিরে না আসে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
এ সময় গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, বর্তমান সংসদ যেন স্বৈরাচার বা একদলীয় শাসনের পথে না গিয়ে গণতন্ত্রের একটি ইতিবাচক মাইলফলক হয়ে ওঠে। তারা বলেন, সংসদের এখন পর্যন্ত কয়েকটি অধিবেশন হয়েছে, তাই সময়ের সঙ্গে সরকারের কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে এর মূল্যায়ন সম্ভব হবে। বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনায় সাংবিধানিক ও অসাংবিধানিক বাস্তবতার মিশ্রণ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তারা। বক্তারা আরও বলেন, শুধু সংস্কার নয়, ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রীয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় কার্যকর করতে হবে এবং গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করা জরুরি। বিদেশি এক রাজনৈতিক নেতার বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে তারা বলেন, এ বিষয়ে ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক মহলকে অবহিত করতে হবে এবং জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাইবার নির্যাতন আইন সংস্কার, চাকরিচ্যুত সাংবাদিকদের পুনর্বহাল এবং মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিতের দাবি জানান। পাশাপাশি নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, মনোনয়ন ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিটিজেন ফোরাম বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আনারুল হক চৌধুরী, অধ্যাপক ড. বোরহানউদ্দিন খান, অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী কায়ছার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান, আলোকচিত্রী ও সমাজকর্মী ড. শহিদুল আলম, জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ, সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নুসরাত তাবাসসুম, ছাত্রদল নেতা আবিদুল ইসলাম খানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।



