৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে জাকারিয়া-কেয়া দম্পতি: বুয়েট থেকে সিভিল সার্ভিসের গল্প
৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে জাকারিয়া-কেয়া দম্পতি

৪৭তম বিসিএসের ফলাফলে প্রশাসন ক্যাডারের তালিকায় পাশাপাশি এসেছেন জাকারিয়া রিভার এবং আফসানা ইসলাম কেয়া। এই দম্পতি ঢাকার নটর ডেম কলেজ ও হলিক্রস কলেজে পড়াশোনা শেষে বুয়েটের ইইই বিভাগে একসঙ্গে ভর্তি হন। ক্যাম্পাস থেকে সিভিল সার্ভিস পর্যন্ত তাদের যাত্রার গল্প শুনতে প্রথম আলো চাকরি-বাকরি অনলাইনের মুখোমুখি হন তারা।

জীবনের শুরু থেকেই মিল

জাকারিয়া বলেন, “আমার বাবা বাংলাদেশ পুলিশে এবং কেয়ার বাবা জেলা সিভিল সার্জন অফিসে কর্মরত। সরকারি চাকরির কারণে আমাদের বাবাদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বদলি হতে হয়েছে।” আফসানা যোগ করেন, “আমাদের নোঙর ছিল ঢাকা শহর। মা ও ভাইবোনদের সঙ্গে আমরা এখানেই স্থায়ীভাবে পড়াশোনা করেছি। আমাদের দুজনেরই মায়েরা পড়াশোনার মূল চালিকা শক্তি।” জাকারিয়া রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল ও নটর ডেম কলেজে এবং আফসানা নৌবাহিনীর স্কুল ও হলিক্রস কলেজে পড়াশোনা করেন। এরপর দুজনের গন্তব্য মিলে যায় বুয়েটের ইইই বিভাগে।

বুয়েটে দেখা ও সম্পর্কের শুরু

আফসানা বলেন, “আমরা বুয়েটে একই ক্লাসে বসতাম। প্রথমে ক্লাসমেট, তারপর বন্ধু। আমাদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা বা চিন্তার ধরন এত মিলে যেত যে অনেক কিছু মুখে বলতে হতো না। এই নীরব বোঝাপড়া থেকেই সম্পর্ক তৈরি হয়।” জাকারিয়া বলেন, “মনের কথা প্রথম মুখে বলার দায়িত্ব আমি নিয়েছিলাম। প্রপোজালটা আমার দিক থেকেই যায়। এরপর জমাট প্রেম। দুই পরিবারের পূর্ণ সম্মতিতে আমরা বিয়ে করি।”

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিদেশের সুযোগ ছেড়ে দেশে থাকার সিদ্ধান্ত

জাকারিয়া বলেন, “আমরা থার্ড বা ফোর্থ ইয়ারেই ঠিক করে ফেলেছিলাম যে বাইরে যাব না। নিজের দেশের মাটিতেই ক্যারিয়ার গড়ব। দেশের মানুষের জন্য সরাসরি কাজ করার অনুভূতিটাই আমাদের কাছে বড়।” আফসানা বলেন, “বাইরে হয়তো আরও অনেক সুযোগ আছে, কিন্তু নিজের জায়গায় থেকেও দারুণ কিছু করা সম্ভব। সেই যৌথ ভাবনা থেকেই সিভিল সার্ভিসকে লক্ষ্য বানানো।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

একসঙ্গে বিসিএসের প্রস্তুতি

জাকারিয়া বলেন, “শুরুতে আমরা একটি বই কিনেই পড়তাম। আমি আগে পড়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো দাগিয়ে রাখতাম। পরে কেয়ার পড়তে অসুবিধা হতো। তখন বুঝলাম, এভাবে হবে না। এরপর থেকে একই বইয়ের দুটি কপি কিনতে শুরু করি।” আফসানা হেসে বলেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, আমরা একে অপরকে বিশ্বাস করতাম। তাই পড়াশোনা নিয়ে অকারণ তর্ক হয়নি।”

পড়াশোনার রুটিন ও ক্লান্তি দূর করার কৌশল

আফসানা বলেন, “আমাদের বেশির ভাগ পড়াশোনা হতো রাতে। দিনে টিউশনি ছিল। কখনো একসঙ্গে বসে পড়তাম, কখনো আলাদা। একজন পড়ে আরেকজনকে বুঝিয়ে দিলে বিষয়টা সহজ হয়ে যেত। একটা অধ্যায় শেষ হলে বা কোনো পরীক্ষা ভালো হলে নিজেদের ছোট্ট পুরস্কার দিতাম—প্রিয় কোনো সিরিজের একটি পর্ব দেখতাম।” জাকারিয়া বলেন, “দুজনেরই ব্রেকিং ব্যাড সিরিজ খুব পছন্দ। বিকেলে আমি নিয়মিত ফুটবল বা ক্রিকেট খেলতাম। তারপর টিউশনি। রাতে ফিরে আবার পড়তে বসতাম। আর পড়াশোনার চাপ বেশি লাগলে সুযোগ পেলেই দুজনে বাইক নিয়ে ঢাকার আশপাশ ঘুরতে বেরিয়ে পড়তাম।”

৪৭তম বিসিএসের প্রশ্নপত্রের মান

জাকারিয়া বলেন, “এবারের প্রশ্ন বেশ ভিন্নধর্মী এবং বিশ্লেষণমূলক ছিল। শুধু গাইড বই মুখস্থ করে পার পাওয়ার দিন শেষ।” আফসানা বলেন, “আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাকগ্রাউন্ড লজিক্যাল থিঙ্কিংয়ে অভ্যস্ত করেছিল। আন্তর্জাতিক বিষয় বা সুশাসনের মতো বড় উত্তরগুলো নিজস্ব বিশ্লেষণে গুছিয়ে লিখতে এই ব্যাকগ্রাউন্ড সাহায্য করেছে।”

ফল প্রকাশের মুহূর্ত

জাকারিয়া বলেন, “পিডিএফ প্রকাশের পর আমিই প্রথমে রেজাল্ট চেক করি। প্রশাসন ক্যাডারের তালিকায় নিজের রোল নম্বর দেখে বড় স্বস্তি কাজ করছিল।” আফসানা বলেন, “ও যখন আমাকে জানাল ও প্রশাসন ক্যাডারে সুযোগ পেয়েছে, আমি খুশিতে এতটাই আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম যে নিজের ফল দেখার কথা মাথাতেই ছিল না! এরপর জাকারিয়াই তালিকায় আমার রোল নম্বর খুঁজে দেয়।”

সমতা ও পারস্পরিক সহানুভূতি

জাকারিয়া বলেন, “বিশ্বজুড়েই এখন প্রমাণিত যে যখন দম্পতিরা সমানভাবে ক্যারিয়ারে অবদান রাখে এবং কাছাকাছি উপার্জন বা স্ট্যাটাস হোল্ড করে, তখন তাদের মধ্যে ইমপ্যাথি অনেক বেশি থাকে। কারণ, আমরা দুজনেই জানি কাজের চাপটা কেমন।” আফসানা বলেন, “আমরা দুজনেই এখন একই ক্যাডারে, তাই কাজের পরিবেশ এবং মানসিক চাপ আমরা খুব ভালো বুঝব। একে অপরের কাজকে সম্মান করা এবং পাশে থাকাটাই সম্পর্ককে মজবুত করে।”

মাঠ প্রশাসনে ভবিষ্যৎ ভাবনা

জাকারিয়া বলেন, “সরকারি অফিস নিয়ে মানুষের অভিযোগ অনেক। সেবা পেতে দেরি হয়, ফাইল আটকে থাকে। অন্তত আমার দায়িত্বের জায়গায় যেন মানুষ এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি না হয়, সেটাই চেষ্টা করব।” আফসানা বলেন, “আমি চাই, আমার দায়িত্বের জায়গাটা অন্তত দুর্নীতিমুক্ত থাকুক। কেউ যেন অন্যায়ভাবে তার ন্যায্য সেবা থেকে বঞ্চিত না হন।”

সহযাত্রীদের জন্য পরামর্শ

আফসানা বলেন, “সঙ্গীকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে সহযাত্রী ভাবা গুরুত্বপূর্ণ। কখনো একজন এগিয়ে থাকবে, কখনো অন্যজন। তখন হীনম্মন্যতায় না ভুগে পাশে থাকাটাই জরুরি। যখন একজন পিছিয়ে পড়ে, অন্যজনকে টেনে তোলাটাই আসল কাজ।” জাকারিয়া বলেন, “আমরা একজন পড়ে আরেকজনকে বুঝিয়ে দিতাম। অনেক সময় কাছের মানুষ যেভাবে বোঝাতে পারে, সেটা অন্য কেউ পারে না। তাই একসঙ্গে প্রস্তুতি নিলে সহযোগিতাই সবচেয়ে বড় শক্তি।”