পোস্ট-ট্রুথ যুগে বাংলাদেশ: গুজব, মব সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের চ্যালেঞ্জ
পোস্ট-ট্রুথ যুগে বাংলাদেশ: গুজব, মব সন্ত্রাস ও বিদ্বেষ

বাংলাদেশ এখন গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিভাজন, ব্যক্তিসম্পর্কে অবিশ্বাস, মব-সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং গুজবভিত্তিক সমাজকাঠামো—সব মিলিয়ে এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে গেছে। একটি ভিডিও, একটি স্ক্রিনশট, একটি এডিটেড ফটো কিংবা একটি বেনামি ফেসবুক পোস্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। যতক্ষণে সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হচ্ছে, ততক্ষণে যার ক্ষতি হওয়ার হয়ে যাচ্ছে। হয়তো ততক্ষণে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বা তার বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পোস্ট-ট্রুথ: সত্যের সংকট

এই বাস্তবতা কেবল প্রযুক্তির সৃষ্টি না। মূল্যবোধের অবক্ষয় ও রাজনৈতিক সংকট থেকেও তৈরি হয়েছে। আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি, যাকে রাজনৈতিক তাত্ত্বিকেরা বলছেন ‘পোস্ট-ট্রুথ এরা’। পোস্ট-ট্রুথ মানে এই নয় যে পৃথিবী থেকে সত্য হারিয়ে গেছে। এটি এমন একধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা, যেখানে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের চেয়ে আবেগ, ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ জনমত গঠনে বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। বাস্তবতার চেয়ে কথিত ‘বিকল্প সত্য’ বা ‘হাইপাররিয়ালিটি’ মানুষের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়। এ কারণে পোস্ট-ট্রুথকে বলা হয় একটি ‘কো-ক্রিয়েটেড ফিকশন’ বা সম্মিলিত কল্পনা, যা রাজনীতিবিদ ও তার সমর্থকগোষ্ঠীরা যৌথভাবে সৃষ্টি করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনীতিবিদেরা অধিকাংশ সময় দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তৃতা দিয়ে থাকেন। আমরা দেখি, নেতারা প্রকাশ্য দিবালোকে ভুল তথ্য দিয়েও পার পেয়ে যাচ্ছেন। আসলে তাঁদের লক্ষ্য তথ্যের নির্ভুলতা নয়; বরং সমর্থকদের কাছে একটি নির্দিষ্ট ‘সংকেত’ পাঠানো। যখন কোনো নেতা তথ্যের ধার না ধেরে বেপরোয়া কথা বলেন, সমর্থকেরা তাঁকে ‘নির্ভীক’ এবং ‘সত্যনিষ্ঠ’ হিসেবে গণ্য করে এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে নেতার ভুল বক্তব্যের পেছনে লজিক তৈরি করে দেয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার, নেতা ভুল বলছেন জেনেও তারা নেতাকে বিশ্বাস করে এবং অপর দিকে মিথ্যা ধরা পড়ে যাচ্ছে জেনেও নেতা মিথ্যা বলা চালিয়ে যান। লেখক অধ্যাপক এলিনা গরোখোভা তাঁর আত্মজীবনী ‘আ মাউন্টেন অব ক্রাম্বস’ বইয়ে বলছেন, ‘দে লাই টু আস, উই নো দে’র লাইং, দে নো উই নো দে’র লাইং, বাট দে কিপ লাইং টু আস, অ্যান্ড উই কিপ প্রিটেন্ডিং টু বিলিভ দেম।’ অর্থাৎ ‘তারা (নেতারা) আমাদের মিথ্যা বলে। আমরা জানি, তারা মিথ্যা বলছে। তারা জানে, আমরাও জানি যে তারা মিথ্যা বলছে। তবু তারা মিথ্যা বলা থামায় না; আর আমরাও সেই মিথ্যাকে বিশ্বাস করি—এমন অভিনয় করে চলি।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এটার প্রভাব কতটা তীব্র হতে পারে, তার সামান্য নমুনা হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফ্যাক্ট চেকিং করে ওয়াশিংটন পোস্ট দেখেছে, আগের মেয়াদে ৪ বছরে ৩০ হাজার ৫৭৩ বার মিথ্যা বা মিস লিডিং তথ্য প্রচার করেছেন ট্রাম্প। কিন্তু এতে ট্রাম্পের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। কারণ, আমরা যে যুগে এসে পৌঁছেছি, সেখানে সত্য আর ফ্যাক্টস-নির্ভর না, হয়ে উঠেছে পারসেপশন-নির্ভর। এ কারণে বলা হচ্ছে সময়টা এখন তথ্যের না, অভিজ্ঞতার। মানুষ এখন সেই মতাদর্শ বা ঘটনা সত্য বলে বিশ্বাস করে, যেটি তার পূর্বতন বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায়।

মিথ্যা কেন সত্যের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়

মিথ্যা জনপ্রিয় হওয়ার প্রধান কারণ হলো এটি এমন করে তৈরি করা হয়, যাতে সেটা পপুলিস্ট সেন্টিমেন্টকে তুষ্ট করে। সত্য সাধারণত জটিল ও প্রমাণনির্ভর। তার চেয়ে বড় কথা, সত্য মানুষের প্রত্যাশা মেনে চলে না। অন্যদিকে গুজব বা ভুয়া খবর মানুষের সেন্টিমেন্ট বুঝে তৈরি হয়। এটা পণ্যের মতো ম্যানুফ্যাকচার্ড। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যে যার মতো করে ভুয়া খবরগুলো তৈরি করে। ফলে ডিজিটাল যুগে মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট তথ্যের অভাব নয়; বরং তথ্যের অতিরিক্ত উপস্থিতি। এই ‘ইনফরমেশন ওভারলোড’ বা ‘তথ্যের অতিপ্রবাহ’ মানুষকে দ্বিধান্বিত করে তোলে। মানুষ তখন অনেকগুলো আপেক্ষিক সত্যের মধ্যে পড়ে একটা সত্য নির্বাচন করার ক্ষেত্রে তার আবেগের আশ্রয় নেয়।

মানুষ এটা কেন করে? হান্নাহ আরেন্টের ভাষায়, আধুনিক সমাজে একধরনের ‘মাসম্যান’ (গণমানুষ) বা ‘সুপারফ্লুয়াস’ (অপ্রয়োজনীয়/উদ্বৃত্ত) মানুষের জন্ম হয়েছে। এরা চরম নিঃসঙ্গ এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। এই বিচ্ছিন্ন মানুষেরা যখন অনলাইনে তাদের মনের মতো একটি সত্য খুঁজে পায়, তারা তখন সেই ‘ফিল্টার বাবল’–এর (তথ্য-বুদ্‌বুদ) ভেতরেই আশ্রয় খোঁজে।

সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম: অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক

আগে সংবাদপত্রের সম্পাদক ঠিক করতেন কোন খবরটি গুরুত্বপূর্ণ। কিংবা কোনো খবরে ভুল তথ্য থাকলে প্রয়োজনীয় সম্পাদনার ভেতর দিয়ে সেটি প্রকাশিত হতো। কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই কাজটা করে দিচ্ছে অদৃশ্য ‘অ্যালগরিদম’ নামক এক অটোমেটেড মেশিন। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক কিংবা অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম আমাদের প্রতিটি লাইক, কমেন্ট, শেয়ার এবং দেখার সময় বিশ্লেষণ করে বুঝে নেয় আমরা কী ধরনের তথ্য পছন্দ করি। এরপর তারা আমাদের সামনে সেই ধরনের কনটেন্টই আরও বেশি তুলে ধরে। আমাদের সামনে একটা ইকো চেম্বার সৃষ্টি হয়। আমরা যা শুনতে, দেখতে বা পড়তে চাই, সেটাই সামনে আসে। আমাদের বিশ্বাস বা ধারণা যদি ভুল হয়, তাতে সেই ভুল বিশ্বাস বা ধারণাটাই আরও বেশি পোক্ত হয়। আমাদের গৃহীত বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে এমন বিষয়গুলো আর সামনে আসে না।

মনে রাখতে হবে, অ্যালগরিদমের উদ্দেশ্য সত্য প্রতিষ্ঠা করা নয়। এর লক্ষ্য হলো ব্যবহারকারীকে যত বেশি সময় সম্ভব প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখা। তাই যে সমাজের মানুষ যে ধরনের কনটেন্ট (পড়ুন ‘গুজব’) পছন্দ করে, তাদের সামনে সেটাই আসতে থাকে। ফলে একজন ব্যক্তি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তাঁর মতই সমাজের সংখ্যাগুরুর মত। এই পরিস্থিতিতে যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ, দুই পক্ষ একই বাস্তবতার মধ্যে পড়ে তাদের মতকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য মত হিসেবে ধরে নেয়। ফলে ইন্টারফেথ ডায়ালগ (আন্তর্ধর্মীয় সংলাপ) তৈরি হওয়ার আর সুযোগ থাকে না। এই কারণে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, একজনের কাছে একটি ভিডিওকে মনে হয় ‘অপরাধের প্রমাণক’, অন্যজনের কাছে সেটি মনে হয় ‘সাজানো নাটক’। একজনের কাছে যেটি ‘সত্য সংবাদ’, অন্যজনের কাছে সেটি ‘ষড়যন্ত্র’। এখানে চলে আসে ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বা নিজের বিশ্বাসকে সমর্থন করে এমন তথ্যকেই গ্রহণ করার প্রবণতার প্রসঙ্গ।

নজরদারি পুঁজিবাদ (সারভেইল্যান্স ক্যাপিটালিজম): আমাদের আবেগ এখন ব্যবসায়িক পণ্য

ডিজিটাল দুনিয়ায় আমাদের প্রতিটি পদচিহ্ন বা ‘ডেটাফিকেশন’ এখন আমাদের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ন্ত্রণ করছে। বড় বড় টেক জায়ান্টরা আমাদের ব্যক্তিগত ডেটা ব্যবহার করে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট ‘অ্যাফ্লিয়েটিভ ট্রুথ’ বা গোষ্ঠীভিত্তিক সত্য তৈরি করে দিচ্ছে। মনে রাখতে হবে, আমাদের আবেগ এখন সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসায়িক পণ্য। শুধু অর্থনৈতিক না, এর রাজনৈতিক ভ্যালুও চূড়ান্ত। যে কারণে সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রলিংকে (ডিপ্লো-ট্রোলিং) বলা হয় আধুনিক কূটনীতির অন্যতম হাতিয়ার। বিভিন্ন দেশের ‘ট্রল আর্মি’র (আমাদের ক্ষেত্রে বটবাহিনীর) কর্মকাণ্ড আজ আন্তর্জাতিক রাজনীতির কার্যকর অংশ। কূটনীতির যে মার্জিত ও প্রথাগত ভাষা ছিল, তাকে ধ্বংস করে ট্রলিং এখন ‘জঁর অব পলিটিক্যাল স্পিচ’ বা রাজনৈতিক বক্তৃতার একটি নতুন ধারা সৃষ্টি করেছে। সীমানা এখন আর ভৌগোলিক নয়, ডিজিটাল। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের মধ্যকার আন্তসম্পর্কে বিভাজন সৃষ্টিতে পেইড গ্রুপ কাজ করছে অনলাইনে। তাদের কাজ মিস ইনফরমেশন ছড়ানো। গুজব সৃষ্টি করা এবং গুজবের পেছনে ব্যাকআপ ডেটা তৈরি করা। বলা হলো কোথাও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে একটা গ্রুপ আগের অন্য কোনো সহিংস ঘটনার ছবি এডিট করে আলোচ্য ঘটনার নামে নেটে ছড়িয়ে দেবে। সাধারণ জনগণের উত্তেজিত অংশটা না বুঝেই ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং সত্যিকার অর্থেই সহিংসতা সৃষ্টি করে প্রচারিত ছবির ন্যায্যাতা তৈরি করে দেবে। তারা জানবেই না কে কোথা থেকে বসে এই সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তারা মনে করবে, এই সিদ্ধান্ত একান্ত তাদের নিজেদের। কিন্তু আদতে সেটা না।

ইকো চেম্বার: আমরা শুধু নিজের কথাই শুনছি

পোস্ট-ট্রুথ যুগের অন্যতম বিপজ্জনক ধারণা এই ‘ইকো চেম্বার’। এটি এমন এক তথ্যজগৎ তৈরি করে, যেখানে মানুষ কেবল নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে এমন মতামতই দেখতে পায়। বিপরীত মত তার সামনে অদৃশ্য হয়ে যায়। ফলে একজন ব্যক্তি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তাঁর মতই সমাজের সংখ্যাগুরুর মত। এই পরিস্থিতিতে যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ, দুই পক্ষ একই বাস্তবতার মধ্যে পড়ে তাদের মতকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য মত হিসেবে ধরে নেয়। ফলে ইন্টারফেথ ডায়ালগ (আন্তর্ধর্মীয় সংলাপ) তৈরি হওয়ার আর সুযোগ থাকে না।

এই কারণে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, একজনের কাছে একটি ভিডিওকে মনে হয় ‘অপরাধের প্রমাণক’, অন্যজনের কাছে সেটি মনে হয় ‘সাজানো নাটক’। একজনের কাছে যেটি ‘সত্য সংবাদ’, অন্যজনের কাছে সেটি ‘ষড়যন্ত্র’। এখানে চলে আসে ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বা নিজের বিশ্বাসকে সমর্থন করে এমন তথ্যকেই গ্রহণ করার প্রবণতার প্রসঙ্গ।

আরও বিপজ্জনক একটি মনস্তাত্ত্বিক ঘটনা হলো ‘ব্যাকফায়ার ইফেক্ট’ বা উল্টো ফলের প্রভাব। কখনো কখনো মানুষকে তার ভুল প্রমাণ করে সত্য তথ্য দেখানো হলেও সে মত পরিবর্তন করে না। বরং নিজের বিশ্বাসকে আরও শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে। কারণ, বিষয়টি আর তার কাছে তথ্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে না; এটি আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন হয়ে ওঠে। সে আর বিপরীত মতের লোকজনের কাছে পরাজিত হতে চায় না। সত্যের চেয়ে ইগোর প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে। ফলে ফ্যাক্ট চেক সিস্টেম তার জন্য অকার্যকর হয়ে পড়ে।

কনফার্মেশন বায়াস: আমরা যা বিশ্বাস করি, সেটাই খুঁজি

মনে রাখতে হবে, মানুষের মস্তিষ্ক নৈর্ব্যক্তিক নয়। ফলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই এমন তথ্য খুঁজি, যা আমাদের আগের বিশ্বাসকে সমর্থন করে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘কনফার্মেশন বায়াস’।

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ধূমপান করেন। তিনি খুঁজে খুঁজে বের করবেন এমন একজন লোকের দৃষ্টান্ত, যিনি কিনা ধূমপান করেও শতবর্ষ বেঁচে ছিলেন। বা একজন স্কুল ড্রপ আউট ব্যক্তি এমন একজনের উদাহরণ হাজির করবেন, যিনি একাডেমিকভাবে উচ্চশিক্ষিত না হয়েও পৃথিবীতে সফল মানুষের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। অথচ কয়েক হাজার মানুষের উদাহরণ দেওয়া যাবে, যাঁরা উচ্চশিক্ষিত হওয়ার কারণে সফল হয়েছেন—একজনের বিপরীতে সেই হাজার হাজার মানুষের দৃষ্টান্ত তার কাছে অদৃশ্য হয়ে যাবে।

এই কারণে, ফেসবুকে দেখা যায়, কোনো ব্যক্তি হয়তো আগে থেকে বিশ্বাস করেন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী সব সমস্যার জন্য দায়ী। এরপর তিনি যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই বিশ্বাসের সঙ্গে মিল আছে, এমন কোনো পোস্ট দেখেন, তখন সেটিকে সহজেই সত্য ধরে নেন। বিপরীতে শত শত তথ্য সামনে এলেও তিনি সেটিকে সন্দেহ করেন। তাঁর এই প্রবণতা পাঠ করে অ্যালগরিদম তাঁকে তাঁর পছন্দের তথ্য পরিবেশন বাড়িয়ে দেয়। তাই প্রকৃত সত্য আর সেই লোকের কোনো কাজে আসে না।

ব্যাকফায়ার ইফেক্ট: সত্যও যখন কাজে আসে না

আরও বিপজ্জনক একটি মনস্তাত্ত্বিক ঘটনা হলো ‘ব্যাকফায়ার ইফেক্ট’ বা উল্টো ফলের প্রভাব। কখনো কখনো মানুষকে তার ভুল প্রমাণ করে সত্য তথ্য দেখানো হলেও সে মত পরিবর্তন করে না। বরং নিজের বিশ্বাসকে আরও শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে। কারণ, বিষয়টি আর তার কাছে তথ্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে না; এটি আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন হয়ে ওঠে। সে আর বিপরীত মতের লোকজনের কাছে পরাজিত হতে চায় না। সত্যের চেয়ে ইগোর প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে। ফলে ফ্যাক্ট চেক সিস্টেম তার জন্য অকার্যকর হয়ে পড়ে।

পোস্ট-ট্রুথের বিপরীতে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি

পোস্ট-ট্রুথের বিপরীতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হতে পারে ‘সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি’—কুন্দেরা যাকে বলছেন ‘প্রশ্নপ্রবণ চেতনা’ বা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিভঙ্গি। অনেকে মনে করেন ‘সেন্সরশিপ’ সমাধান। কিন্তু সেন্সরশিপের নীতিমালা তৈরি করবে বা বাস্তবায়ন করবে যে পক্ষ তাকেও আমরা আর বিশ্বাস করতে পারি না। ফলে ‘সেন্সরশিপ’ আরোপ করে সমালোচনার পথ বন্ধ করার প্রচেষ্টা হিতে বিপরীত হয়ে যায়—সমাজে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তির চর্চার ক্ষেত্র আরও সংকুচিত হয়ে আসে। একটি দেশের গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষ যুক্তি দিয়ে মতভেদ করতে শেখে; বিদ্বেষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। এই সত্য-উত্তর বাস্তবতায় আমাদের রক্ষাকবচ হতে পারে দেশের সহিষ্ণু, চিন্তাশীল নাগরিক।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা: গুজব, মব সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ

বাংলাদেশে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অনেকগুলো গুজব সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পোস্ট, এডিটেড ছবি বা পুরোনো ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে গুজবের ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে।

তবে প্রতিটি সহিংস ঘটনার পেছনে শুধু ফেক নিউজ থাকে না; রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামাজিক অবিশ্বাস, বিদ্যমান বৈষম্য এবং সাংগঠনিক উসকানিও ভূমিকা রাখে। গুজব সেই উত্তেজনাকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। পোস্ট-ট্রুথের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটা এখানেই। মানুষ যখন কোনো গুজবকে নিজের পরিচয়, ধর্ম বা রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে, তখন সেটিকে যাচাই করার প্রয়োজন অনুভব করে না। তখন সে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে যুক্তিবোধের জায়গা দখল করে নেয় তাৎক্ষণিক আবেগ। সেই আবেগকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয় সরকার। কারণ, গণসেন্টিমেন্টকে পুঁজি করে বাংলাদেশের প্রতিটা সরকার তার অন্যান্য অপকর্মের বৈধতা নিশ্চিত করে। সরকারের কাজ হয়ে যায় অ্যালগরিদমের মতো: সত্য প্রতিষ্ঠা করা নয়, বিদ্যমান বিশ্বাসকে সন্তুষ্ট করা।

ঘৃণার ভাষা কীভাবে স্বাভাবিক হয়ে যায়

পোস্ট-ট্রুথ রাজনীতি কেবল মিথ্যা ছড়ায় না; সমাজকে বিভক্তও করে। ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’—সর্বত্র এই বিভাজন তৈরি হয়। সহানুভূতি বা সহমর্মিতার ঘাটতি দেখা দেয়। এর চূড়ান্ত পরিণতিতে প্রতিপক্ষকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, দেশের শত্রু, ধর্মের শত্রু কিংবা জাতির শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই বিভেদের ভাষা যত বেশি প্রচারিত হয়, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহানুভূতিও তত কমতে থাকে। ঘৃণার ভাষা শেষ পর্যন্ত সহিংসতার সামাজিক বৈধতা তৈরি করে। কারণ, তখন প্রতিপক্ষকে মানুষ আর সমান মর্যাদার নাগরিক হিসেবে দেখে না। মনে করে তার চেয়ে তার প্রতিপক্ষের মানবিক অধিকার কম। কেন কম সেই যৌক্তিকতা সে তৈরি করে ফেলে। এর ভেতর দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে একধরনের ডিসটোপিয়ান অবস্থা তৈরি হয়। অর্থাৎ এমন এক সামাজিক বা রাজনৈতিক বাস্তবতা, যেখানে স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও সত্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

ডিসটোপীয় সমাজের কতগুলো দিক থাকে। এখানে একটি নিয়ন্ত্রক শক্তি থাকে—তা হতে পারে সরকার, সেনাবাহিনী, করপোরেশন, ধর্ম—যা ব্যক্তির চিন্তা ও স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। মানুষ তার দুর্ভোগকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেয়। কোনো কিছু নিয়ে প্রশ্ন করে না। এই প্রশ্নহীন সমাজটাই ডিসটোপিয়ান সমাজ। হান্নাহ আরেন্টের মতে, সমাজের এই অবস্থা এক দিনে তৈরি হয় না। একটু একটু করে সাধারণ মানুষের সবকিছু মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়। আরেন্ট নিজে নাৎসি জার্মানি থেকে পালিয়ে রক্ষা পেয়েছিলেন। এরপর সারা জীবন একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন: এত বড় একটি গণহত্যা কীভাবে সম্ভব হলো? কারা ঘটাল আর কারা এর অনুমোদন দিল? আরেন্ট আবিষ্কার করেন, এই সাংঘাতিক গণহত্যার সঙ্গে সাধারণ মানুষও জড়িত ছিল। তাদের ভাষ্যে, তারা শুধু নির্দেশ পালন করেছে মাত্র। প্রত্যেকে তার দায়িত্ব পালন করে গেছে। তারা কোনো প্রশ্ন করেনি। যে লোকটা ট্রেন চালায়, সে ঠিক সময়ে ট্রেনটা পৌঁছেছে কি না ভেবেছে। কিন্তু সেই ট্রেনের যাত্রীদের হত্যা করার জন্য কোনো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে নেওয়া হচ্ছে কি না, সে ভেবে দেখেনি। এই না ভাবাটাকেই আরেন্ট বলেছেন ‘বান্যালিটি অব ইভিল’—মন্দের সাধারণত্ব। পোস্ট–ট্রুথ বাস্তবতায় এই চিন্তাহীনতার পরিস্থিতি আমাদের আরও সাংঘাতিক পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা হয়তো সরাসরি কোনো মব ভায়োলেন্সে অংশ নিচ্ছি না, কিন্তু প্রতিনিয়ত ভায়োলেন্স তৈরি করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছি বা সম্মতি উৎপাদন করে দিচ্ছি।

উত্তরণের পথ

পোস্ট-ট্রুথের বিপরীতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হতে পারে ‘সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি’—কুন্দেরা যাকে বলছেন ‘প্রশ্নপ্রবণ চেতনা’ বা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিভঙ্গি। অনেকে মনে করেন ‘সেন্সরশিপ’ সমাধান। কিন্তু সেন্সরশিপের নীতিমালা তৈরি করবে বা বাস্তবায়ন করবে যে পক্ষ তাকেও আমরা আর বিশ্বাস করতে পারি না। ফলে ‘সেন্সরশিপ’ আরোপ করে সমালোচনার পথ বন্ধ করার প্রচেষ্টা হিতে বিপরীত হয়ে যায়—সমাজে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তির চর্চার ক্ষেত্র আরও সংকুচিত হয়ে আসে। একটি দেশের গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষ যুক্তি দিয়ে মতভেদ করতে শেখে; বিদ্বেষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। এই সত্য-উত্তর বাস্তবতায় আমাদের রক্ষাকবচ হতে পারে দেশের সহিষ্ণু, চিন্তাশীল নাগরিক।