রাজশাহীতে যুবদল কার্যালয়ে চার তরুণকে মারধর ও চুল কেটে দেওয়ার ঘটনা তদন্তের দাবি
রাজশাহীতে যুবদল কার্যালয়ে চার তরুণকে মারধর ও চুল কেটে দেওয়া

রাজশাহী নগরীতে চুরির অভিযোগ তুলে চার তরুণকে এক যুবদল নেতার কার্যালয়ে নিয়ে শাটার লাগিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বেধড়ক মারধর করা হয়েছে। শেষে ওই চার তরুণের মাথার চুলও কেটে দেওয়া হয়েছে। পরে আহত অবস্থায় তাঁদের পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। মারধর ও চুল কেটে দেওয়ার ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

ঘটনার বিবরণ

গত মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহী নগরের শাহমখদুম থানাধীন আলিফ-লাম-মীম ভাটা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। রাজশাহী মহানগর যুবদলের সদস্য মো. শাকিলুর রহমানের (রন) কার্যালয়ে পুরো ঘটনাটি ঘটেছে। ঘটনাটি গতকাল ঘটলেও আজ বুধবার দুপুরের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

মারধরের শিকার তরুণরা হলেন হুমায়ুন কবির (মিম), তাঁর চাচাতো ভাই মো. আলিফ, আবদুস সামাদ ও দেব। তাঁদের সবার বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। তাঁরা রাজশাহী নগরের শাহ মখদুম এলাকার বাসিন্দা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভিডিওতে যা দেখা যায়

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ৩৯ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, মারধরের সময় চার তরুণ যন্ত্রণায় কাঁদছেন এবং প্রাণভিক্ষা চাইছেন। যুবদলের কার্যালয়ের ভেতরে কাঠের টুকরা দিয়ে অন্তত দুজন ব্যক্তি চার তরুণকে বেধড়ক পেটাচ্ছেন। যন্ত্রণায় ছটফট করছেন তরুণেরা। পরে তাঁদের বসিয়ে ট্রিমার দিয়ে মাথার চুল কেটেও দেওয়া হয়।

পরিবারের অভিযোগ

তরুণদের পরিবারের অভিযোগ, গত মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর ১৮ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় কয়েকটি দোকান থেকে সিগারেট চুরি সন্দেহে চার তরুণকে ধরে স্থানীয় যুবদল নেতা সাকিলুর রহমানের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শাটার নামিয়ে তাঁদের লাথি-ঘুষির পাশাপাশি লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। পরে তাঁদের চুল কেটে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে চারজনকেই পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মারধরের শিকার হুমায়ুন কবিরের মা লিপি ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, স্থানীয় একটি দোকান থেকে অল্প কিছু সিগারেট চুরি হয়েছিল। কিন্তু দোকানের সিসিটিভি ফুটেজে তাঁর ছেলেকে চুরি করতে দেখা যায়নি। তিনি বলেন, ‘ফুটেজে আমার ছেলেকে কিছু চুরি করতে দেখা যায়নি। শুধু ও আর ওর চাচাতো ভাইকে ওই এলাকা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা গেছে। সেটার ভিত্তিতেই ওদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।’

লিপি ইসলাম আরও বলেন, ‘আমার ছেলে যদি অপরাধ করে থাকে, পুলিশে দিত। কিন্তু ক্লাবের (যুবদলের কার্যালয়) শাটার নামিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যেভাবে মারা হয়েছে, সেটা কোনো সভ্য সমাজে হতে পারে না। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই। মারধরের সময় চারজনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত করা হয় এবং তাঁদের চুল কেটে দেওয়া হয়। ঘটনার সময় পরিবারের কাউকে জানানো হয়নি।’

অভিযুক্তদের নাম

ভুক্তভোগী তরুণদের স্বজনেরা অভিযোগ করেন, মারধরের ঘটনায় স্থানীয় কয়েকজনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে যুবদল ও ছাত্রদলের অনুসারী ও নেতা জীবন, হাসান, টুটুল, মেরাজ ও লিটন নামে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, জড়িতদের কয়েকজন স্থানীয়ভাবে বিএনপি, যুবদল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

যুবদল নেতার বক্তব্য

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার না করলেও ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন রাজশাহী মহানগর যুবদলের সদস্য সাকিলুর রহমান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহে তাঁর কার্যালয়সহ আশপাশের অনেক বাড়ি ও দোকানে চুরি হয়েছে। সর্বশেষ একটি দোকানে চুরির ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁদের ধরে তাঁর কার্যালয়ে নিয়ে আসে।

সাকিলুরের দাবি, ঘটনার সময় তিনি কার্যালয়ে ছিলেন না। একটি কাজে বাইরে ছিলেন। পরে এসে দেখেন সেখানে অনেক লোক জড়ো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছি। পুলিশকে ফোন করেছি। পুলিশ আসতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। পরে তাঁদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।’

কার্যালয়ের ভেতরে মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে সাকিলুরের ভাষ্য, ‘দলীয় অফিসে এ ধরনের ঘটনা হওয়া ঠিক হয়নি। তবে আমি যখন পৌঁছাই, তখন পরিস্থিতি এমন ছিল যে কাউকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।’ চুল কেটে দেওয়া ও মারধরের নির্দেশ কারা দিয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি হঠাৎ গিয়ে ওই পরিস্থিতি দেখেছি। কে কী করেছে, সেটা আমি বলতে পারব না। এলাকায় অনেক মানুষের ক্ষোভ ছিল।’

আইনি প্রক্রিয়া

এদিকে দোকান থেকে চুরির অভিযোগে রাসেল আহমেদ নামে এক ব্যক্তির মামলায় মারধর ও নির্যাতনের শিকার চার তরুণকে বুধবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠান হয়েছে। তরুণদের পরিবারের পক্ষ থেকেও মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

নগরের শাহমখদুম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কবির হোসেন বলেন, চার তরুণের বিরুদ্ধে একটি দোকানে চুরির অভিযোগে মামলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা সিগারেটসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি চুরি করেন। সিসিটিভি ফুটেজে তাঁদের শনাক্ত করার পর স্থানীয় লোকজন আটক করে মারধর করেছে। পুলিশ জানতে পেরে তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়।

চুল কেটে দেওয়ার একটি ভিডিও প্রসঙ্গে ওসি জানান, ওই চার তরুণের মাথায় কিছু কিছু চুল ছিল না। তবে কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা তদন্ত করে নিশ্চিত হতে হবে। ওসি আরও বলেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগীদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।