নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আইডিইএ-২ প্রকল্পের আওতায় ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র সার্ভারের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ কেনাকাটায় ভয়াবহ দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বেশ কিছু গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।
ঘুষ ও জালিয়াতির চিত্র
তদন্তে দেখা গেছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নগদ টাকা ও দামি মোবাইল ফোন ঘুষ হিসাবে নিয়েছেন ইসির কয়েকজন কর্মকর্তা। তদন্তে ধরা পড়ার পর অভিযুক্ত পাঁচজন ঘুষের টাকা ও মোবাইল ফেরতও দিয়েছেন। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে কমিশন।
তদন্ত কমিটির অনুসন্ধান
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে আইডিইএ-২ প্রকল্পের আওতায় আইটি যন্ত্রাংশ ও আনুষঙ্গিক মালামাল কেনা হয়। জিডি-৩৬.১ এবং জিডি-৫৭ প্যাকেজের মালামাল কেনা ও ব্যবহারে অনিয়ম পেয়েছে এ প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মেজর মো. তারেক আজিজের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি। যদিও কমিটিতে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের কেউ ছিলেন না।
জিডি-৩৬.১ প্যাকেজে অনিয়ম
প্যাকেজ জিডি ৩৬.১ এর আওতায় ভোটার তালিকার সার্ভারের জন্য আট ধরনের এক হাজার ৪০২ পিস যন্ত্রাংশ এবং ইসির কর্মকর্তাদের ল্যাপটপের জন্য পাঁচ ধরনের তিন হাজার ৫০ পিস নতুন ও অরিজিনাল যন্ত্রাংশ কেনার জন্য টেন্ডার হয়। চার কোটি ৪৩ লাখ ৫১ হাজার টাকায় ওইসব যন্ত্রাংশ সরবরাহের কাজ পায় ‘টিমওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সল্যুশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান।
- সার্ভারের জন্য ডেল ব্র্যান্ডের ২০০ পিস টাইপ-১ মাদারবোর্ড সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে ৫৮ পিস পেয়েছে তদন্ত কমিটি। বাকি ১৪২ পিস মাদারবোর্ডের হদিস নেই।
- যেসব মাদারবোর্ড পাওয়া গেছে সেগুলোও নতুন নয়, রিফার্বিশড।
- ৮০০ পিস হার্ডডিস্ক সরবরাহের কথা থাকলেও তদন্ত কমিটি ৪৪৫ পিস পেয়েছে। সেগুলোও রিফার্বিশড।
- ১০০ পিস প্রসেসরের স্থলে পেয়েছে ৫১ পিস। তাও স্থানীয় প্যাকেটজাত করা এবং কুলিং ফ্যান নেই।
- ল্যাপটপের জন্য এক হাজার ২০০ এসএসডি’র স্থলে পেয়েছে ২০৪টি।
- ৪০০ পিস র্যাম সরবরাহের কথা থাকলেও কমিটি এক পিসও পায়নি।
- ল্যাপটপের অ্যাডাপ্টার ২৫০ পিসের স্থলে ১২ পিস পেয়েছে কমিটি।
অভিযুক্ত ব্যক্তিরা
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. তারেক রহমানসহ প্রকল্পের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এই জালিয়াতিতে জড়িত। অন্যরা হলেন-আইডিইএ-২ প্রকল্পের হার্ডওয়্যার কনসালটেন্ট কে. এম মাসুদুর রহমান কামাল, সহকারী প্রোগ্রামার মো. সুজন হোসেন, সহকারী প্রোগ্রামার মো. মাজেদুর রহমান ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. ফজলে রাব্বী।
ঠিকাদারকে ঘুষ
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুযায়ী সব মালামাল সরবরাহ করেনি। কিছু মালামাল সরবরাহ করেছে। বাকি মালামালের বিনিময়ে ১৮ লাখ টাকা উপঢৌকন দিয়েছেন। সুজন হোসেন তদন্ত কমিটিকে দেওয়া জবানবন্দিতে জানান, ১৮ লাখ টাকা থেকে তার সহযোগী মাজেদুর রহমানকে ৮ লাখ টাকা এবং আরেক সহযোগী ফজলে রাব্বীকে দুই লাখ টাকা দিয়েছেন। যদিও একপর্যায়ে তিনজনই কমিটির কাছে সব টাকা ফেরত দিয়েছেন।
টেন্ডার কারসাজি
টিমওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মালিক মো. তারেক রহমানের টেন্ডার কারসাজির সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রমাণ পেয়েছে কমিটি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তার মোবাইলে হোয়াটস অ্যাপ চ্যাটে এ প্রকল্পের তৎকালীন উপপ্রকল্প পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিকের (বর্তমানে জনসংযোগ অধিশাখার পরিচালক) সঙ্গে টেন্ডার ডকুমেন্ট এবং প্রতিষ্ঠানের ব্ল্যাঙ্ক প্যাড আদান-প্রদানের তথ্য পাওয়া যায়।
জিডি-৫৭ প্যাকেজে অনিয়ম
আরেকটি অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে জিডি-৫৭ প্যাকেজে। এই প্যাকেজের আওতায় কল সেন্টারের জন্য ২৭টি অনলাইন ইউপিএস ও কম্পিউটার-ল্যাপটপের এসএসডি কেনা হয়। এসব মালামাল সরবরাহ করেন ডাইভারসিটি নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রেও নিম্নমানের মালামাল সংগ্রহের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এসব মালামাল কেনার বিনিময়ে সহকারী প্রোগ্রামার মো. সুজন হোসেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে স্যামসাং ব্র্যান্ডের এস২৫ মডেলের দামি ফোন নেন। সহকারী পরিচালক শফিউল্লাহ নেন ওয়ান প্লাস ব্র্যান্ডের দামি ফোন। তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হলে তারা মোবাইল ফোন ফেরত দিয়েছেন।
প্রতিক্রিয়া
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, অনিয়মের ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ইসির কর্মকর্তাদের অপরাধের মাত্রা আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আইডিইএ-২ প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী যুগান্তরকে বলেন, ওই ঘটনায় জড়িত প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা স্থগিত করা হয়েছে। কয়েকজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।



