ছেলের ছবি বুকে নিয়ে আহাজারি করছেন জায়হানের মা জোবাইদা বেগম। জায়হানকে যখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন স্বজনদের সঙ্গে খুঁজতে বের হন প্রতিবেশী মো. সাইফুদ্দিন। বাড়ির পাশের পুকুরসহ বিভিন্ন স্থানে তল্লাশিতে অংশও নেন তিনি। একপর্যায়ে জায়হানের বাবা মো. শাহজাহানের সঙ্গে বসে চা-ও পান করেন। পরিবারের কেউই তখন সন্দেহ করেনি, সাইফুদ্দিন এই হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
গতকাল বুধবার গভীর রাতে বাড়ির পেছনের ময়লার স্তূপ থেকে জায়হানের বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার হয়। গত মঙ্গলবার দুপুরে থেকে নিখোঁজ ছিল সে। স্বজনেরা থানায় ডায়েরি করার পর গতকাল দুপুরে পুলিশ জায়হানদের প্রতিবেশী সাইফুদ্দিন, তাঁর স্ত্রী শানু আক্তার ও মেয়ে সাদিয়া সুলতাোকে (১৯) আটক করে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। একপর্যায়ে জায়হানের হত্যার কথা স্বীকার করেন তাঁরা। এরপর তাদের দেখিয়ে দেওয়া স্থান থেকে উদ্ধার করা হয় জায়হানের লাশ।
পরিবারের শোক
চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্ব পাড়ার মো. শাহজাহান ও জোবাইদা বেগমের একমাত্র ছেলে ছিল জায়হান। এক বোন, এক ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল ছোট। বুকের ধনকে হারিয়ে শোকে বিহ্বল পরিবারটি। পাঁচ বছর বয়সী শিশু জায়হানের হত্যাকাণ্ডে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীও। আজ বৃহস্পতিবার সকালে পটিয়া ডাকবাংলা ও থানা এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়েছেন এলাকার সর্বস্তরের মানুষজন।
আজ সকালে দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্ব পাড়ায় জায়হানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। জায়হানের মা জোবাইদা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আঁর ফোয়ারে ঘরত মারি রাহি আই, এডে আঁরার লগে দুরের। (আমার ছেলেকে ঘরে হত্যার পর খুনি এসে আমাদের সঙ্গে খোঁজ করেছে।)’
জোবাইদা বলেন, ১৫ বছর ধরে সাইফুদ্দিনরা তাঁদের প্রতিবেশী। তিনি কল্পনাও করেননি, প্রতিবেশীরা এমন কাজ করতে পারে। তাঁর একটাই দাবি, ছেলে হত্যার বিচার।
হত্যার পেছনের কারণ
মঙ্গলবার জায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর চিরকুট দিয়ে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়। চিরকুটের হাতের লেখার সূত্র ধরেই পুলিশ অভিযুক্তদের শনাক্ত করেছে। পুলিশের দাবি, পার্শ্ববর্তী আরেক প্রতিবেশীকে ফাঁসানোর জন্য সাইফুদ্দিন এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। জায়হানের মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিয়াউল হক প্রথম আলোকে বলেন, সাইফুদ্দিনের সঙ্গে তাঁর প্রতিবেশী ও চাচাতো ভাইয়ের জমিসংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। এর জের ধরে জায়হানকে হত্যা করে চাচাতো ভাইয়ের ওপর দোষ চাপাতে চেয়েছিলেন সাইফুদ্দিন। এ জন্য তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। এ ঘটনায় মামলা হচ্ছে।
এদিকে, চট্টগ্রামে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘটনাটির বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। তিনি বলেন, সাইফুদ্দিনের মেয়ে সাদিয়া সুলতানার হাতের লেখার সঙ্গে চিরকুটের লেখার মিল ছিল। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে শিশুটিকে হত্যা করা হয়।
মায়ের বেদনা
নিহত জায়হানের মা জোবাইদা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলের মাথায় নাকি হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেছে। তখন আমার ছেলেটার কী কষ্ট হয়েছিল, সেটা একমাত্র আল্লাহই জানেন। প্রায় ১৫ বছর ধরে তারা আমাদের প্রতিবেশী। কখনো কল্পনাও করিনি, তারা এমন নিষ্ঠুর কাজ করতে পারে। আমার ছেলে আমাকে ছাড়া এক দিনও থাকতে পারত না। সেই ছেলেকে হত্যা করে তারা দুই দিন বস্তাবন্দী করে রেখেছিল।’
অপহরণের পরও একবার ছেলের কণ্ঠস্বর শুনেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। জোবাইদা বেগম বলেন, ‘আমি চারদিকে ছুটে ছুটে আমার ছেলেকে খুঁজেছি। ওরা আমার ছেলেকে কোনো আওয়াজ করতে দেয়নি। কিন্তু একবার আমার ছেলে “ও মা” বলে ডেকেছিল। সেই ডাক আমার কানে এসেছিল। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এটা কি আমার ছেলের আওয়াজ? তখন তারা বলেছিল, না, এটা আমার ছেলে নয়, অন্য কারও আওয়াজ।’



