শাহজালাল বিমানবন্দরে ফেব্রিক্স পাচার: জালিয়াতি ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো খালাসে ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনা উদ্ঘাটন করেছে গোয়েন্দা সংস্থা। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে চীন থেকে আমদানি করা চার হাজার ২৩৭ কেজি ফেব্রিক্স কোনও প্রকার শুল্কায়ন ছাড়াই খালাস করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা তদন্তে এ ঘটনার বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে এবং দায়ীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ও তদন্তের সূচনা
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানতে পারেন, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এইচ. বি. এস. অ্যাপারেলস লি. নামে ২০২৫ সালের ১৭, ২৩ এবং ২৪ নভেম্বর চীন থেকে তায়ানজিন এয়ার কার্গো এবং এসএফ এয়ারলাইন্সযোগে ফেব্রিক্স আমদানি করা হয়। একই বছরের ২৭ নভেম্বর এ ফেব্রিক্সগুলো কার্গো থেকে খালাস করা হয়। বিমান এবং কাস্টমসের অসাধু চক্রের সহায়তায় কোনও প্রকার বিল অফ এন্ট্রি ও কাস্টমস শুল্কায়ন ছাড়াই সেগুলো খালাস করা হয়।
ঘটনার পর বিমানবন্দরজুড়ে আলোচনা শুরু হয় এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তদন্ত শুরু করে। তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্ত কর্মকর্তারা বিমানের সংশ্লিষ্ট অফিস ও আমদানি কার্গো ডেলিভারি খুঁজে জানতে পারেন, গেটে রক্ষিত রেজিস্টারে পাচার হওয়া পণ্যের এয়ার ওয়েবিল নাম্বারগুলো লিপিবদ্ধ থাকলেও বিল অফ এন্ট্রি সংক্রান্ত কোনও নথি পাওয়া যায়নি।
জালিয়াতির পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান
পরবর্তীকালে ইমপোর্ট এয়ারওয়ে ডেলিভারি সেকশনে খোঁজ নিয়ে তারা দেখেন, গত ২৭ ডিসেম্বর ও ৫ ডিসেম্বর উল্লেখিত এয়ার ওয়েবিলগুলো সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান বারি এন্টারপ্রাইজ এবং আল ইতিহাদের সহায়তায় উত্তোলন করা হয়। সেক্ষেত্রে আইডি কার্ডসহ সকল কাগজাদি জালিয়াতি করে প্রতিষ্ঠানগুলো। পরবর্তীতে কাস্টমসের সার্ভারে চেক করে কোনও বিল অফ এন্ট্রি পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বিমানের রেকর্ড সেকশন থেকে জানতে পারেন, গত ৯ জানুয়ারি রাত ৯টায় বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা কমার্শিয়াল সুপারভাইজার কাজী মোহাম্মদ শাহজালাল, মন্তাছার রহমান ও মো. রাজীব শরিফের কাছে চারটি বিল অফ এন্ট্রির সকল নথি দেওয়া হয়। তারা জোরপূর্বক ও অর্থের বিনিময়ে সেগুলো নিয়মিতকরণের জন্য বলেন।
সিন্ডিকেট ও নিরাপত্তা হুমকি
তদন্তের এক পর্যায়ে কর্মকর্তারা এইচ. বি. এস. অ্যাপারেলস লি. এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর হুমায়ন কবিরের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, উক্ত এয়ার ওয়েবিলের প্রেক্ষিতে তার প্রতিষ্ঠানের নামে কোনও পণ্য আমদানি করা হয়নি। এতেই গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, এইচ. বি. এস নাম ব্যবহার করে সম্পূর্ণ জালিয়াতির মাধ্যমে এ কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করেন, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এইচ. বি. এস. অ্যাপারেলস লি. কোম্পানির কমার্শিয়াল ডিপার্টমেন্টের অসাধু কর্মচারীর যোগসাজশে বিমান ও কাস্টমসের অসাধু চক্রের সহযোগিতায় কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে পণ্য আমদানি করে অন্য কারো কাছে অধিকমূল্যে বিক্রয় করে হতে পারে। এছাড়াও আমদানি কার্গো এবং কাস্টমসের কোনও রকম শুল্কায়ন ব্যবস্থা অনুসরণ না করে পণ্য খালাস করায় প্রতীয়মান হয়, বিদেশ থেকে যেকোনো ধরনের দ্রব্য কোনও প্রকার নথি ও শুল্কায়ন ছাড়াই দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করানো সম্ভব। এমনকি, পণ্যের আমদানি ঘোষণার আড়ালে দেশে নাশকতার সৃষ্টির উদ্দেশে বিষ্ফোরক, অস্ত্র, মাদক কিংবা অন্য যেকোনো আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য দেশে আনা যেতে পারে। সামগ্রিকভাবে বিষয়টি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য একটি বিরাট হুমকি বলেও মনে করেন তারা।
জড়িত ব্যক্তিবর্গ ও সুপারিশ
নিয়ম বহির্ভূতভাবে পণ্য খালাস এবং পরবর্তীতে ভুয়া কাগজপত্র দেওয়াতে কাজী মোহাম্মদ শাহজালাল এবং মন্তাছার রহমানের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে তদন্ত কর্মকর্তারা। এছাড়া বহুদিন যাবৎ এ সেকশনে কর্মরত থাকায় তাদের দুর্নীতি লাগামহীন পর্যায়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে ডিউটি রোষ্টার বাণিজ্য, আধিপত্য বিস্তার, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তোয়াক্কা না করাসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও নৈরাজ্যের অভিযোগ আছে।
ফেব্রিক্স খালাস প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতরা হলেন, জুনিয়র কমার্শিয়াল অফিসার আবুল কালাম, অ্যাসিস্ট্যান্ট কমার্শিয়াল ম্যানেজার মো. রফিকুল আলম, অ্যাসিস্ট্যান্ট কমার্শিয়াল ম্যানেজার এবাদত হোসেন, জুনিয়র সিকিউরিটি অফিসার বেনজির আহম্মেদ, নিরাপত্তা তত্বাবধায়ক ফিরোজ ইফতেখার, কার্গো হেলপার শাহীন শেখ, শাহদাত হোসেন ও শাওন আহম্মেদ রাজু। এছাড়া সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শামিম আহম্মেদ ও রাগিব হোসাইনও এ জালিয়াতিতে যুক্ত ছিলেন।
তদন্ত কর্মকর্তাদের সুপারিশ অনুযায়ী, সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ও অকাট্য প্রমাণাদি থাকায় কাজী মোহাম্মদ শাহজালাল ও মন্তাছার রহমানকে আইনের আওতায় নিয়ে এসে শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে কার্গো সেকশনকে সিন্ডিকেট মুক্ত করতে অতিদ্রুত তাদের সেখান থেকে অপসারণের জন্য বলা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্টতার জন্য সিএন্ডএফ কর্মী জুনায়েদ, রকিবুল ও আবু তালেবের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও তাদেরকে কালো তালিকাভুক্ত করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
সরকারের বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার মতো এ ধরনের গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা কাস্টমস হাউজ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল কবির ভুঁইয়া মিঠু। তিনি বলেন, “এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য না। যারা জড়িত তারা শাস্তি পাক, এটি আমাদের দাবি।”
এ বিষয়ে বিমান ও কাস্টমসের একাধিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
