দায়িত্ব গ্রহণের আড়াই মাসের মাথায় সারা দেশে নতুন করে সরকারকে চিন্তিত করছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বিভিন্ন স্থানে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বেশ কিছু ঘটনা সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। এ সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মারা গেছেন কমপক্ষে ১৩ জন। মার্চ-এপ্রিলে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৭ শতাধিক নেতাকর্মী। এর মধ্যে মার্চে ৯ ও এপ্রিলে নিহতের সংখ্যা ৪ জন। আর আহত মার্চে ২৪৭ ও এপ্রিলে ৫০১ জন।
সহিংসতার প্রকৃতি ও প্রতিবেদন
আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, হামলা, দলীয় কোন্দল ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে বেশিরভাগ ঘটনা ঘটেছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে এ ধরনের তথ্য উঠে এসেছে। নির্বাচনের আগেই এসব বিষয়ে জিরো টলারেন্সের কথা জানিয়ে আসছিল বিএনপির হাইকমান্ড।
গত ১ মে নয়াপল্টনে শ্রমিক দলের সমাবেশে দলীয় নেতাকর্মীদের শৃঙ্খলা রক্ষার তাগিদ দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ওই সভায় তিনি বলেন, ‘অন্যায়ের সঙ্গে জড়িতদের টপ টু-বটম কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
সম্প্রতি একই কথা বলেছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশে ব্যাপক দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটেছে। এখনও কেউ কেউ এমন আচরণ করার চেষ্টা করলে দলীয় নেতাদেরও ছাড় দেওয়া হবে না।’ শীর্ষ নেতাদের এমন কঠোর মনোভাবের কারণে প্রশ্ন উঠেছে, শিগগিরই কি দলে শুদ্ধি অভিযান শুরু হবে? হলেও বা কবে শুরু হতে পারে? এক্ষেত্রে কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে? এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
মার্চ-এপ্রিলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের চিত্র
সরকারের প্রথম দুই মাসে সংঘটিত বেশ কিছু ঘটনা সরকারকে এক ধরনের চাপে ফেলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদন তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চে দেশে ১১৩টি সহিংসতার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৪৫টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৫০১ জন ও নিহত ৯ জন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ১৬টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১০৯ জন ও নিহত ৫ জন।
এইচআরএসএস জানায়, এপ্রিলে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৪০টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ৪ জন নিহত ও ২৪৭ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া দলের অন্যান্য সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল ও যুবদলেও নিজেদের মধ্যে নানা সহিংসতার খবর আসছে। শুধু তাই নয়, বিএনপির সঙ্গে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের নেতাকর্মীদেরও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
কোন প্রক্রিয়ায় বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
দলের চেইন অব কমান্ড ঠিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক রাখতে শিগগিরই নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে বিএনপি। এক্ষেত্রে দলের কেউ গঠনতন্ত্র ও শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজ করলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে বিতর্কিত নেতাকর্মীদের সরিয়ে দেওয়া হবে। সামনে আনা হবে ক্লিন ইমেজধারীদের। এছাড়া গুরুতর অপরাধীদের বিরুদ্ধে দলের পক্ষ থেকেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার আগে প্রকৃত ঘটনার সরেজমিন তদন্ত করা হবে। এতে দোষী প্রমাণিত হলেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মূল দল বিএনপি থেকে শুরু করে সহযোগী সব সংগঠনের বেলায়ই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বুধবার (৬ মে) রাতে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে আমাদের নেতাকর্মীরা ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তখন তাদের নানা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। তারপরও তারা কোনও অন্যায়ে জড়িত হয়নি। তবে এখন যেহেতু দল ক্ষমতায়, তাদের নাম ভাঙ্গিয়ে কেউ কেউ নানা অপকর্ম করতে পারে—যা বিএনপির দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে পারে। তাই আমরা দলে শুদ্ধি অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শিগগিরই এ ব্যাপারে দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।’ তিনি বলেন, ‘মূলত বিতর্কিত নেতাকর্মীদের সরিয়ে স্বচ্ছ ও ত্যাগী নেতাদের সামনে আনা হবে। এক্ষেত্রে সাংগঠনিক কমিটি হতে পারে। আমলনামা অনুযায়ী গুরুতর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে দল থেকেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কবে নাগাদ শুদ্ধি অভিযান
বিএনপির দলীয় সূত্র জানায়, আগামী ঈদুল আজহার পরপরই কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হবে। এতে অঞ্চলভিত্তিক নেতারা সাংগঠনিক সফরও করতে পারেন। সম্পন্ন করা হবে অঙ্গসংগঠনের সব কমিটি। তবে তার আগেই দলের সর্বস্তরে শুদ্ধি অভিযান চালানো হবে। বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকবে হাই কমান্ড।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপি সব সময় অন্যায়ের বিপক্ষে। অন্যায় করলে অতীতের মতো দলীয় নেতাকর্মীদেরও ছাড় দেওয়া হবে না। দল ও সরকারকে বিতর্কমুক্ত রাখতে প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্সের কথা জানিয়েছেন। এ নির্দেশনা সর্বস্তরে দেওয়া আছে। শিগগিরই এ নিয়ে কাজ করবেন শীর্ষ নেতারা।’



